Dhaka , Sunday, 29 January 2023

অনর্থক সমালোচনা খুলে দেয় গুনাহর দুয়ার

  • Robiul Islam
  • আপডেট টাইম : 08:10:14 am, Saturday, 24 December 2022
  • 15 বার

ইসলাম ডেস্ক: ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অন্যতম সৌন্দর্য হলো অহেতুক ভাবনা থেকে বেঁচে থাকা। আমারা প্রাত্যহিক জীবনে যেসব অহেতুক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ি তার মধ্যে মানুষকে নিয়ে অনর্থক আলোচনা-সমালোচনা অন্যতম। বন্ধুর আড্ডা বা পারিবারিক মজলিশে যেখানেই কথার আসর জমে সেখানেই আলোচনার বড় একটা অংশ থাকে অন্যকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা।

অন্যকে নিয়ে আমাদের এত কৌতূহল কেন, এ বিষয়ে বেশ কিছু দিন চিন্তাভাবনা করেছি। অনেক ভাবনা-চিন্তার পর দেখেছি, কাজের মতো কাজ না থাকলেই মানুষ অকাজে সময় ব্যয় করে। আমাদের দেশের বড় একটা অংশ বেকার। বেকাররাই অন্যকে নিয়ে চর্চা করাকে মহৎ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। এ ছাড়াও আমরা যারা কাজ করি তাদের মধ্যে অনেকের কাজে ফাঁকি দেওয়ার চিন্তাই বেশি থাকে। চা খেতে গিয়ে আড্ডা, নামাজ পড়তে গিয়ে দেরি করা, খাবার খেতে গিয়ে আয়েশ করাসহ আরও কতভাবে যে আমরা কাজে ফাঁকি দিই তার ইয়ত্তা নেই। কাজে ফাঁকি দেওয়ার সময়ে আমরা আড্ডা জমাই। কখনো শারীরিক আড্ডা।

আবার কখনো ভার্চুয়াল আড্ডা। যেভাবেই হোক দু-চারজন মানুষ একত্র হলেই অন্যের সমালোচনা করা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলাম অন্যকে নিয়ে এমন বেহুদা উৎসাহী হওয়ার বিষয়টি হারাম করেছে।

অন্যের সমালোচনার ফলে যে শুধু আমরা গিবতই করি তা না, এতে আমাদের ভিতর ওই ব্যক্তির ব্যাপারে নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়। যার সমালোচনা করি বা শুনি ওই মানুষটির সঙ্গে পরবর্তীতে আর খোলা মন নিয়ে কথা বলতে পারি না। কেমন যেন অন্তরের নূর নিভে যায়। এ ছাড়াও যার সমালোচনা করা হয় তার ব্যাপারে মানুষ আরও নিশ্চিত হতে চায় সে আসলেই এসব অপরাধ করে কি না। এবং এসব ছাড়াও তার আর কোনো অপরাধ আছে কি না সে বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করে দেয়। সহজ কথায় অন্য মুসলমান ভাইয়ের গোপন বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। ফলে সে গিবতের পাশাপাশি আরেকটি কবিরা গুনাহ তথা গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

এ সম্পর্কে এহইয়াউল উলুমুদ্দিনে একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণনা করেছেন ইমাম গাজালি (রহ.)। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি লিখেন, প্রত্যেক মুসলমানের জন্য এ কাজগুলো আবশ্যক হলেও কোনো ব্যক্তি গোপনে অসৎ কাজ করছে কি না সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা সাধারণভাবে জায়েজ নেই। উদাহরণস্বরূপ তিনি একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। হজরত ওমর (রা.) এর অভ্যাস ছিল রাতের আঁধারে তিনি মানুষের অবস্থার খোঁজখবর নিতেন। নাগরিকদের জীবনমান সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতেন।

একদিন তিনি এক বাড়ির দেয়াল টপকে ঢুকে পড়লেন। তিনি দেখলেন এক যুবক মদ পান করছে। ওমর (রা.) বললেন, হে যুবক! এবার তোমার কোনো নিস্তার নেই। তুমি হাতেনাতে ধরা পড়েছ। যুবক ওমর (রা.) কে বলল, হে আমিরুল মোমিনিন- আমি মদ পান করে তো একটি নাফরমানি করেছি, আর আপনি আমার ঘরে উঁকি দিয়ে তিনটি নাফরমানি করেছেন। প্রথমত, আল্লাহ বলেছেন, ওয়ালাতাজাসসাছু- তোমরা একে অন্যের গোপন দোষ খুঁজো না। আপনি আমার গোপন দোষ খুঁজেছেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ বলেছেন, ওয়াআতুল বুয়াতু মিন আবওয়াবিহা- তোমরা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ কর।

আপনি দেয়াল টপকে আমার ঘরে প্রবেশ করেছেন। তৃতীয়ত, আল্লাহ বলেছেন, তোমরা কারও ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে বিনা অনুমতি ও সালাম না করে প্রবেশ করো না। আপনি সেটাই করেছেন। যুবকের এমন যুক্তিপূর্ণ জবাব শুনে ওমর (রা.) নিরুত্তর হয়ে যুবককে ছেড়ে দিলেন।

প্রিয় পাঠক! আজকের এ লেখায় আমরা বলতে চাচ্ছি, অন্যের দোষ নিয়ে চর্চা করা আমাদের জন্য শোভা পায় না। অন্যের দোষ চর্চা শুধু যে মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকে তা না, এর পরিণতি আরও ভয়ংকরও হতে পারে। কখনো কখনো এমনো হতে পারে, গিবত থেকে খুনোখুনিও হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের কর্তব্য, নিজের কাজে মশগুল থাকা। মানুষের নামে ভালো বলা। সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Robiul Islam

অনর্থক সমালোচনা খুলে দেয় গুনাহর দুয়ার

আপডেট টাইম : 08:10:14 am, Saturday, 24 December 2022

ইসলাম ডেস্ক: ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অন্যতম সৌন্দর্য হলো অহেতুক ভাবনা থেকে বেঁচে থাকা। আমারা প্রাত্যহিক জীবনে যেসব অহেতুক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ি তার মধ্যে মানুষকে নিয়ে অনর্থক আলোচনা-সমালোচনা অন্যতম। বন্ধুর আড্ডা বা পারিবারিক মজলিশে যেখানেই কথার আসর জমে সেখানেই আলোচনার বড় একটা অংশ থাকে অন্যকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা।

অন্যকে নিয়ে আমাদের এত কৌতূহল কেন, এ বিষয়ে বেশ কিছু দিন চিন্তাভাবনা করেছি। অনেক ভাবনা-চিন্তার পর দেখেছি, কাজের মতো কাজ না থাকলেই মানুষ অকাজে সময় ব্যয় করে। আমাদের দেশের বড় একটা অংশ বেকার। বেকাররাই অন্যকে নিয়ে চর্চা করাকে মহৎ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। এ ছাড়াও আমরা যারা কাজ করি তাদের মধ্যে অনেকের কাজে ফাঁকি দেওয়ার চিন্তাই বেশি থাকে। চা খেতে গিয়ে আড্ডা, নামাজ পড়তে গিয়ে দেরি করা, খাবার খেতে গিয়ে আয়েশ করাসহ আরও কতভাবে যে আমরা কাজে ফাঁকি দিই তার ইয়ত্তা নেই। কাজে ফাঁকি দেওয়ার সময়ে আমরা আড্ডা জমাই। কখনো শারীরিক আড্ডা।

আবার কখনো ভার্চুয়াল আড্ডা। যেভাবেই হোক দু-চারজন মানুষ একত্র হলেই অন্যের সমালোচনা করা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলাম অন্যকে নিয়ে এমন বেহুদা উৎসাহী হওয়ার বিষয়টি হারাম করেছে।

অন্যের সমালোচনার ফলে যে শুধু আমরা গিবতই করি তা না, এতে আমাদের ভিতর ওই ব্যক্তির ব্যাপারে নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়। যার সমালোচনা করি বা শুনি ওই মানুষটির সঙ্গে পরবর্তীতে আর খোলা মন নিয়ে কথা বলতে পারি না। কেমন যেন অন্তরের নূর নিভে যায়। এ ছাড়াও যার সমালোচনা করা হয় তার ব্যাপারে মানুষ আরও নিশ্চিত হতে চায় সে আসলেই এসব অপরাধ করে কি না। এবং এসব ছাড়াও তার আর কোনো অপরাধ আছে কি না সে বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করে দেয়। সহজ কথায় অন্য মুসলমান ভাইয়ের গোপন বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। ফলে সে গিবতের পাশাপাশি আরেকটি কবিরা গুনাহ তথা গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

এ সম্পর্কে এহইয়াউল উলুমুদ্দিনে একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণনা করেছেন ইমাম গাজালি (রহ.)। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি লিখেন, প্রত্যেক মুসলমানের জন্য এ কাজগুলো আবশ্যক হলেও কোনো ব্যক্তি গোপনে অসৎ কাজ করছে কি না সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা সাধারণভাবে জায়েজ নেই। উদাহরণস্বরূপ তিনি একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। হজরত ওমর (রা.) এর অভ্যাস ছিল রাতের আঁধারে তিনি মানুষের অবস্থার খোঁজখবর নিতেন। নাগরিকদের জীবনমান সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতেন।

একদিন তিনি এক বাড়ির দেয়াল টপকে ঢুকে পড়লেন। তিনি দেখলেন এক যুবক মদ পান করছে। ওমর (রা.) বললেন, হে যুবক! এবার তোমার কোনো নিস্তার নেই। তুমি হাতেনাতে ধরা পড়েছ। যুবক ওমর (রা.) কে বলল, হে আমিরুল মোমিনিন- আমি মদ পান করে তো একটি নাফরমানি করেছি, আর আপনি আমার ঘরে উঁকি দিয়ে তিনটি নাফরমানি করেছেন। প্রথমত, আল্লাহ বলেছেন, ওয়ালাতাজাসসাছু- তোমরা একে অন্যের গোপন দোষ খুঁজো না। আপনি আমার গোপন দোষ খুঁজেছেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ বলেছেন, ওয়াআতুল বুয়াতু মিন আবওয়াবিহা- তোমরা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ কর।

আপনি দেয়াল টপকে আমার ঘরে প্রবেশ করেছেন। তৃতীয়ত, আল্লাহ বলেছেন, তোমরা কারও ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে বিনা অনুমতি ও সালাম না করে প্রবেশ করো না। আপনি সেটাই করেছেন। যুবকের এমন যুক্তিপূর্ণ জবাব শুনে ওমর (রা.) নিরুত্তর হয়ে যুবককে ছেড়ে দিলেন।

প্রিয় পাঠক! আজকের এ লেখায় আমরা বলতে চাচ্ছি, অন্যের দোষ নিয়ে চর্চা করা আমাদের জন্য শোভা পায় না। অন্যের দোষ চর্চা শুধু যে মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকে তা না, এর পরিণতি আরও ভয়ংকরও হতে পারে। কখনো কখনো এমনো হতে পারে, গিবত থেকে খুনোখুনিও হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের কর্তব্য, নিজের কাজে মশগুল থাকা। মানুষের নামে ভালো বলা। সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।