Dhaka , Wednesday, 8 February 2023

রোমে চিরনিদ্রায় শায়িত বাংলার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন

  • Robiul Islam
  • আপডেট টাইম : 07:54:34 am, Thursday, 12 January 2023
  • 18 বার

প্রবাস ডেস্ক: রোমে চিরনিদ্রায় শায়িত বাংলার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী ১০ জানুয়ারি। ১৯৯৭ সালের ১০ জানুয়ারি ইতালির রাজধানীর এক নির্জন এপার্টমেন্টে জীবনাবসান ঘটে আত্ম-অভিমানী এই মেধাবী বাঙালির।

 

১৯৫৯ সাল থেকে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন রোমে। দেশটির ‘প্রথম বাংলাদেশি’ শামসুদ্দীন আবুল কালামের জন্ম ১৯২৬ সালে বরিশালে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ইতালি থেকে জনমত সৃষ্টি করে অসামান্য অবদান রাখেন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে। ১৯৫৯ থেকে ১৯৯৭ রোমে সুদীর্ঘ ৩৮ বছরের প্রবাস জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিঃসঙ্গতা গ্রাস করলেও দেশটির কর্মক্ষেত্রে ছিল তাঁর সফল পদচারণা। সত্তরের দশকে কর্মরত ছিলেন রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থ (ফাও) সদর দফতরে এবং বাংলাদেশ দূতাবাসে। কাজ করেন ইতালিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও।

 

ইতালিতে আসার আগেই পঞ্চাশের দশকে প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের বেশ ক’টি বিখ্যাত উপন্যাস। স্বনামধন্য এই কথাসাহিত্যিকের সবচাইতে সাড়াজাগানো উপন্যাস ‘কাশবনের কন্যা’র প্রকাশকাল ১৯৫৪ সাল। পরবর্তীতে পাঠকদের তৃষ্ণা মেটাতে আসে উপন্যাস দুই মহল (১৯৫৫), কাঞ্চনমালা (১৯৫৬), জীবন কান্ড (১৯৫৬), জাইজঙ্গল (১৯৭৮), মনের মতো স্থান (১৯৮৫), সমুদ্রবাসর (১৯৮৬), যার সাথে যার (১৯৮৬), নবান্ন (১৯৮৭) ও কাঞ্চনগ্রাম (১৯৮৭)। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের বছর ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের গল্প সংগ্রহ ‘অনেক দিনের আশা’। পরের বছর ‘ঢেউ’ ও ‘পথ জানা নেই’। দুই হৃদয়ের তীর (১৯৫৫) এবং সাহের বানু (১৯৫৭) এই বাঙ্গালী গুণীজনেরই অমর সৃষ্টি।

 

১৯৫৯ সালে ইতালি পাড়ি জমাবার আগে সংসার জীবনে খুব একটা সুখী হতে পারেননি শামসুদ্দীন আবুল কালাম। কন্যা ক্যামেলিয়ার জন্মের পর স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স হয়ে গেলে পরবর্তীতে ঐ ভদ্রমহিলাকে বিয়ে করেন প্রখ্যাত অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। নতুন সংসারে জন্ম হয় সুবর্ণার, যিনি পরবর্তিতে বাবার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে সুবর্ণা মোস্তফা নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং নারী কোটায় এমপি হিসেবেও পরিচিতি পান। সৎবোন ক্যামেলিয়া মোস্তফা অভিনয় জগতে থাকলেও পাড়ি জমান বিদেশ বিভুঁইয়ে, বাবার পথ ধরে। তবে ইতালিতে আসেননি ক্যামেলিয়া, নিউইয়র্কের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ নেন জীবিকার তাগিদে।

 

১৯৯৭ সালে শামসুদ্দীন আবুল কালামের মৃত্যুর সময় নিউইয়র্কেই অবস্থান করছিলেন কন্যা ক্যামেলিয়া মোস্তফা। বৈধ স্টে পারমিট না থাকার কারণে আমেরিকা থেকে বের হতে পারেননি তখন তিনি। অবশ্য মৃত্যুর পরপরই বাবার একাউন্টে থাকা প্রায় ১২ হাজার ডলারের সমপরিমাণ ইতালিয়ান লিরা আমেরিকাতে বসেই দ্রুত বুঝে নেন ক্যামেলিয়া। বেশ কয়েক বছর পর ক্যামেলিয়া বাংলাদেশ ফিরে গেলেও ইতালিতে বাবার সমাধি এক নজর দেখতে আসার প্রয়োজন মনে করেননি। তার উদাসীনতার কারণেই মূলতঃ শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমাধি বিগত ২৬ বছরে রোমের খ্রিস্টান গোরস্থান থেকে পাশের মুসলিম গোরস্থানে স্থানান্তরিত হয়নি।

 

সত্তর ও আশির দশকে ইতালিতে ছিল খুব স্বল্প সংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস। নব্বইর দশকে দেশটিতে বাংলাদেশিদের আগমন দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও স্বদেশীদের সাথে খুব একটা মেশা হয়ে ওঠেনি তাঁর। বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরীর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আরেক প্রবীন বাংলাদেশি লুৎফর রহমান যিনি এখনও জীবিত আছেন, মূলতঃ তাঁর সাথেই কদাচিৎ দেখা-সাক্ষাৎ হতো শামসুদ্দীন আবুল কালামের। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রচন্ড অভিমানী এই কথাসাহিত্যিক জীবনের শেষ দিনগুলোতে এতোটাই জীবনবিমূখ হয়ে উঠেছিলেন যে, ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্বেও বাজার করতেন না এমনকি প্রায়শই খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে এবং জীবনরক্ষাকারী ঔষধ সেবন না করে স্বেচ্ছায় ধাবিত হন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।

 

শামসুদ্দীন আবুল কালামের দুঃখজনক মৃত্যুর সময় ১৯৯৭ সালে আমি রাজধানী রোমে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুবাদে ঐ সময়কার ঢাকার একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকের ইতালি প্রতিনিধির দায়িত্বে ছিলাম, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে আমরা কিছুই জানতে পারিনি। অপ্রিয় কিন্তু যৌক্তিক কারনে তখন জানার সুযোগও ছিলো না আমাদের। প্রবীণ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব লুৎফর রহমান সহ আমরা অবগত হই রোমে তাঁকে সমাহিত করার বেশ কিছুদিন পর লন্ডনের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ঢাকার অন্য একটি দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হবার পর। রোম পৌর প্রশাসন কর্তৃক পরে আমাদের অবহিত করা হয় শামসুদ্দীন আবুল কালাম তাঁর নির্জন এপার্টমেন্টে মারা যাবার বেশ কয়েক ঘন্টা পর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল বহুতল ভবনের বাইরে থেকে জানালা ভেঙ্গে লাশ উদ্ধার করে।

 

শামসুদ্দীন আবুল কালামের মরদেহ উদ্ধারের পর ডকুমেন্টে বা অন্য কোথাও ধর্মীয় পরিচয় না থাকায় এবং আত্মীয় বা নিকটজন কারো কোন সন্ধান পুলিশ না পেয়ে মূলতঃ বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তাঁকে রোমের এক প্রান্তে প্রিমাপর্তা এলাকায় কোন প্রকার জানাজা ছাড়াই খ্রিস্টান গোরস্থানে সমাহিত করে। পাশেই মুসলিম গোরস্থান থাকলেও রক্ত-সম্পর্কীয় নিকটজনের অনুমতি না পাওয়ায় আজও স্থানান্তর করা হয়ে ওঠেনি বাংলার এই প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকের সমাধি। প্রবীণ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব লুৎফর রহমান বিগত বছরগুলোতে যখনই সময় পেয়েছেন ছুটে গেছেন প্রিমাপর্তা সমাধিক্ষেত্রে, করেছেন পরিচর্চা। নিউইয়র্কে এবং ঢাকায় কন্যা ক্যামেলিয়াকে অতীতে বহুবার নক করা হলেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জন্মদাতা পিতার সমাধি সঠিক জায়গায় স্থানান্তরের সামান্য ক্লিয়ারেন্স দেবার তাগিদ অনুভব করেননি।

 

শামসুদ্দীন আবুল কালামের প্রতি উদাসীন ইতালির বাংলাদেশ কমিউনিটিও। বাংলাদেশ ভিত্তিক অবৈধ রাজনীতি, জেলা থানা ইউনিয়ন ভিত্তিক আঞ্চলিকতার ভিলেজ পলিটিক্স চর্চা এবং দালালি কাম ঠকবাজিতে পুরোদমে ব্যস্ত থাকার পরিণতিতে কমিউনিটির মাথামোটা নেতারাও কখনোই সম্মান দেখায়নি প্রিমাপর্তা সমাধিক্ষেত্রে পড়ে থাকা বাংলার এই সোনার সন্তানকে। যে দূতাবাসে একদা কর্মরত ছিলেন রোমের বাংলাদেশ দূতাবাসও তাঁর স্মৃতি রক্ষায় দারুণ উদাসীন। দূতাবাসের নিজস্ব ভবনে পাঠাগার বা মিলনায়তন শামসুদ্দীন আবুল কালামের নামে নামকরণের পাশাপাশি প্রতি বছর ১০ জানুয়ারি দূতাবাসের উদ্যোগে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হলে বাংলাদেশের ইমেজ বৃদ্ধি পেতো বহুগুণে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কার কানে কে দেবে পানি?

 

লেখক: মাঈনুল ইসলাম নাসিম

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Robiul Islam

রোমে চিরনিদ্রায় শায়িত বাংলার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন

আপডেট টাইম : 07:54:34 am, Thursday, 12 January 2023

প্রবাস ডেস্ক: রোমে চিরনিদ্রায় শায়িত বাংলার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী ১০ জানুয়ারি। ১৯৯৭ সালের ১০ জানুয়ারি ইতালির রাজধানীর এক নির্জন এপার্টমেন্টে জীবনাবসান ঘটে আত্ম-অভিমানী এই মেধাবী বাঙালির।

 

১৯৫৯ সাল থেকে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন রোমে। দেশটির ‘প্রথম বাংলাদেশি’ শামসুদ্দীন আবুল কালামের জন্ম ১৯২৬ সালে বরিশালে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ইতালি থেকে জনমত সৃষ্টি করে অসামান্য অবদান রাখেন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে। ১৯৫৯ থেকে ১৯৯৭ রোমে সুদীর্ঘ ৩৮ বছরের প্রবাস জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিঃসঙ্গতা গ্রাস করলেও দেশটির কর্মক্ষেত্রে ছিল তাঁর সফল পদচারণা। সত্তরের দশকে কর্মরত ছিলেন রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থ (ফাও) সদর দফতরে এবং বাংলাদেশ দূতাবাসে। কাজ করেন ইতালিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও।

 

ইতালিতে আসার আগেই পঞ্চাশের দশকে প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের বেশ ক’টি বিখ্যাত উপন্যাস। স্বনামধন্য এই কথাসাহিত্যিকের সবচাইতে সাড়াজাগানো উপন্যাস ‘কাশবনের কন্যা’র প্রকাশকাল ১৯৫৪ সাল। পরবর্তীতে পাঠকদের তৃষ্ণা মেটাতে আসে উপন্যাস দুই মহল (১৯৫৫), কাঞ্চনমালা (১৯৫৬), জীবন কান্ড (১৯৫৬), জাইজঙ্গল (১৯৭৮), মনের মতো স্থান (১৯৮৫), সমুদ্রবাসর (১৯৮৬), যার সাথে যার (১৯৮৬), নবান্ন (১৯৮৭) ও কাঞ্চনগ্রাম (১৯৮৭)। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের বছর ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের গল্প সংগ্রহ ‘অনেক দিনের আশা’। পরের বছর ‘ঢেউ’ ও ‘পথ জানা নেই’। দুই হৃদয়ের তীর (১৯৫৫) এবং সাহের বানু (১৯৫৭) এই বাঙ্গালী গুণীজনেরই অমর সৃষ্টি।

 

১৯৫৯ সালে ইতালি পাড়ি জমাবার আগে সংসার জীবনে খুব একটা সুখী হতে পারেননি শামসুদ্দীন আবুল কালাম। কন্যা ক্যামেলিয়ার জন্মের পর স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স হয়ে গেলে পরবর্তীতে ঐ ভদ্রমহিলাকে বিয়ে করেন প্রখ্যাত অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। নতুন সংসারে জন্ম হয় সুবর্ণার, যিনি পরবর্তিতে বাবার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে সুবর্ণা মোস্তফা নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং নারী কোটায় এমপি হিসেবেও পরিচিতি পান। সৎবোন ক্যামেলিয়া মোস্তফা অভিনয় জগতে থাকলেও পাড়ি জমান বিদেশ বিভুঁইয়ে, বাবার পথ ধরে। তবে ইতালিতে আসেননি ক্যামেলিয়া, নিউইয়র্কের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ নেন জীবিকার তাগিদে।

 

১৯৯৭ সালে শামসুদ্দীন আবুল কালামের মৃত্যুর সময় নিউইয়র্কেই অবস্থান করছিলেন কন্যা ক্যামেলিয়া মোস্তফা। বৈধ স্টে পারমিট না থাকার কারণে আমেরিকা থেকে বের হতে পারেননি তখন তিনি। অবশ্য মৃত্যুর পরপরই বাবার একাউন্টে থাকা প্রায় ১২ হাজার ডলারের সমপরিমাণ ইতালিয়ান লিরা আমেরিকাতে বসেই দ্রুত বুঝে নেন ক্যামেলিয়া। বেশ কয়েক বছর পর ক্যামেলিয়া বাংলাদেশ ফিরে গেলেও ইতালিতে বাবার সমাধি এক নজর দেখতে আসার প্রয়োজন মনে করেননি। তার উদাসীনতার কারণেই মূলতঃ শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমাধি বিগত ২৬ বছরে রোমের খ্রিস্টান গোরস্থান থেকে পাশের মুসলিম গোরস্থানে স্থানান্তরিত হয়নি।

 

সত্তর ও আশির দশকে ইতালিতে ছিল খুব স্বল্প সংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস। নব্বইর দশকে দেশটিতে বাংলাদেশিদের আগমন দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও স্বদেশীদের সাথে খুব একটা মেশা হয়ে ওঠেনি তাঁর। বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরীর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আরেক প্রবীন বাংলাদেশি লুৎফর রহমান যিনি এখনও জীবিত আছেন, মূলতঃ তাঁর সাথেই কদাচিৎ দেখা-সাক্ষাৎ হতো শামসুদ্দীন আবুল কালামের। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রচন্ড অভিমানী এই কথাসাহিত্যিক জীবনের শেষ দিনগুলোতে এতোটাই জীবনবিমূখ হয়ে উঠেছিলেন যে, ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্বেও বাজার করতেন না এমনকি প্রায়শই খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে এবং জীবনরক্ষাকারী ঔষধ সেবন না করে স্বেচ্ছায় ধাবিত হন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।

 

শামসুদ্দীন আবুল কালামের দুঃখজনক মৃত্যুর সময় ১৯৯৭ সালে আমি রাজধানী রোমে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুবাদে ঐ সময়কার ঢাকার একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকের ইতালি প্রতিনিধির দায়িত্বে ছিলাম, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে আমরা কিছুই জানতে পারিনি। অপ্রিয় কিন্তু যৌক্তিক কারনে তখন জানার সুযোগও ছিলো না আমাদের। প্রবীণ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব লুৎফর রহমান সহ আমরা অবগত হই রোমে তাঁকে সমাহিত করার বেশ কিছুদিন পর লন্ডনের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ঢাকার অন্য একটি দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হবার পর। রোম পৌর প্রশাসন কর্তৃক পরে আমাদের অবহিত করা হয় শামসুদ্দীন আবুল কালাম তাঁর নির্জন এপার্টমেন্টে মারা যাবার বেশ কয়েক ঘন্টা পর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল বহুতল ভবনের বাইরে থেকে জানালা ভেঙ্গে লাশ উদ্ধার করে।

 

শামসুদ্দীন আবুল কালামের মরদেহ উদ্ধারের পর ডকুমেন্টে বা অন্য কোথাও ধর্মীয় পরিচয় না থাকায় এবং আত্মীয় বা নিকটজন কারো কোন সন্ধান পুলিশ না পেয়ে মূলতঃ বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তাঁকে রোমের এক প্রান্তে প্রিমাপর্তা এলাকায় কোন প্রকার জানাজা ছাড়াই খ্রিস্টান গোরস্থানে সমাহিত করে। পাশেই মুসলিম গোরস্থান থাকলেও রক্ত-সম্পর্কীয় নিকটজনের অনুমতি না পাওয়ায় আজও স্থানান্তর করা হয়ে ওঠেনি বাংলার এই প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকের সমাধি। প্রবীণ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব লুৎফর রহমান বিগত বছরগুলোতে যখনই সময় পেয়েছেন ছুটে গেছেন প্রিমাপর্তা সমাধিক্ষেত্রে, করেছেন পরিচর্চা। নিউইয়র্কে এবং ঢাকায় কন্যা ক্যামেলিয়াকে অতীতে বহুবার নক করা হলেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জন্মদাতা পিতার সমাধি সঠিক জায়গায় স্থানান্তরের সামান্য ক্লিয়ারেন্স দেবার তাগিদ অনুভব করেননি।

 

শামসুদ্দীন আবুল কালামের প্রতি উদাসীন ইতালির বাংলাদেশ কমিউনিটিও। বাংলাদেশ ভিত্তিক অবৈধ রাজনীতি, জেলা থানা ইউনিয়ন ভিত্তিক আঞ্চলিকতার ভিলেজ পলিটিক্স চর্চা এবং দালালি কাম ঠকবাজিতে পুরোদমে ব্যস্ত থাকার পরিণতিতে কমিউনিটির মাথামোটা নেতারাও কখনোই সম্মান দেখায়নি প্রিমাপর্তা সমাধিক্ষেত্রে পড়ে থাকা বাংলার এই সোনার সন্তানকে। যে দূতাবাসে একদা কর্মরত ছিলেন রোমের বাংলাদেশ দূতাবাসও তাঁর স্মৃতি রক্ষায় দারুণ উদাসীন। দূতাবাসের নিজস্ব ভবনে পাঠাগার বা মিলনায়তন শামসুদ্দীন আবুল কালামের নামে নামকরণের পাশাপাশি প্রতি বছর ১০ জানুয়ারি দূতাবাসের উদ্যোগে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হলে বাংলাদেশের ইমেজ বৃদ্ধি পেতো বহুগুণে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কার কানে কে দেবে পানি?

 

লেখক: মাঈনুল ইসলাম নাসিম