Dhaka , Thursday, 25 April 2024

মাগফিরাত, রহমত ও নাজাতের মাস রমজান

  • Robiul Islam
  • আপডেট টাইম : 08:05:29 am, Saturday, 1 April 2023
  • 44 বার

ইসলাম ডেস্ক: পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে করে তোমরা মুত্তাকি হতে পার’ (সুরা বাকারা-১৮৩)। সুতরাং শুধু আমাদের ওপর নয়, আমাদের পূর্ববর্তী মানুষের ওপরও রোজা রাখা ফরজ ছিল। রোজা কী? শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নামই সাওম। তবে সুবেহ সাদিক উদয় হওয়ার পূর্ব থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সিয়ামের নিয়তে একাধারে এভাবেই বিরত থাকলেই তা সিয়াম বলে গণ্য হবে। সূর্যাস্তের ১ মিনিট আগেও যদি কিছু রোজাদার খেয়ে ফেলে, পান করে কিংবা স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হয় তাহলে সিয়াম বা রোজা হবে না। সিয়াম যদিও একটি কষ্টকর ইবাদত কিন্তু এর পুরস্কার অসীম।

তাকওয়ার শক্তি অর্জন করার ব্যাপারে সিয়ামের বিশেষ ভূমিকা বিদ্যমান। সিয়ামের মাধ্যমে প্রবৃত্তির তাড়না নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মুমিনের জীবনে রমজান হলো আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাস। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজা অন্যতম।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়, একটি নেকির সওয়াব ১০ গুণ থেকে ২৭ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কিন্তু রোজার প্রতিদান আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্যই নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে’ (মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ)। অন্য বর্ণনায় আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য, পক্ষান্তরে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব’ (বুখারি)।

জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন শুধু রোজাদার ব্যক্তিরাই এই দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। অন্য কেউ পারবে না। যে ব্যক্তি ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে সে জান্নাতের পানীয় পান করবে। সে কখনো পিপাসার্ত হবে না (মুসনাদে আহমাদ)।

এই পবিত্র মাসে আল্লাহ রব্বুল আলামিন রসুল (সা.)-এর ওপর পবিত্র কোরআন নাজিল করেন। মহাগ্রন্থ কোরআন মানবজাতির জন্য দিকনির্দেশনা। আল্লাহ বলেন, ‘রোজার মাস এমন একটি মাস যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, আর এ কোরআন হচ্ছে মানবজাতির পথের দিশা। সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন; হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে এ মাসটি পাবে সে রোজা রাখবে’ (সুরা বাকারা-১৮৫)।

সুরা আল কদরে আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই আমি এ গ্রন্থটি এক মর্যাদাপূর্ণ রাতে নাজিল করেছি। তুমি কি জানো সেই মর্যাদাপূর্ণ রাতটি কী? মর্যাদাপূর্ণ রাতটি হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম’ (আয়াত ১-৩) সুবহানাল্লাহ। সুতরাং এ মাসে আমাদের সবার বেশি বেশি কোরআন পাঠ করা উচিত।

সারা দিন রোজা রেখে সূর্যাস্তের পর পানাহারের মাধ্যমে রোজাদার তার উপবাস ভঙ্গ করেন। তাকেই ইফতার বলে। ইফতার শিগগিরই করা উত্তম। মহানবী (সা.) খেজুর আর পানি দিয়ে ইফতার করতেন। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি খুশি, একটি ইফতারের সময় অপরটি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়’ (মুসলিম)। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে তার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে এবং রোজাদারের সওয়াবের সমপরিমাণ সওয়াব সে লাভ করবে’ (মুসনাদে আহমাদ) সুবহানাল্লাহ। একজন রোজাদারের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

রমজান মাসে খতম তারাবি থেকে অংশ নেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রমজানের রাতে সাহাবিরা একসঙ্গে দুই রাকাত করে তারাবির নামাজ আদায় করতেন। দুই রাকাতের মাঝে তারা কিছুটা সময় বিশ্রাম নিতেন। এ জন্যই এই নামাজের নাম তারাবির নামাজ।

রমজানের শেষ দশকে মুমিন মুত্তাকি বান্দাদের জন্য রয়েছে এক বিশেষ রাত লাইলাতুল কদর। এই রাতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর ইমানদার ও রোজাদার বান্দাদের জন্য করুণাধারা বর্ষণ করেন। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘কদরের রাতে যে ব্যক্তি একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাত জেগে ইবাদতে (নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, তসবিহ পাঠ) মশগুল থাকে তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়’ (বুখারি) সুবহানাল্লাহ। রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবেকদর অন্বেষণ করার জন্য রসুল (সা.) সাহাবাদের তাগিদ দিয়েছেন। এই রমজানে যত বেশি দান সদকা করা যায় ততই উত্তম। আমাদের মনে রাখতে হবে, রমজান হলো আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া এবং নিজের আত্মশুদ্ধির মাস। রমজান পাওয়ার পর যে নিজেকে পাপ মুক্ত করতে পারল না তার মতো হতভাগা আর কেউ নেই।

আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা লাভের আশায় রমজানে দ্রব্যমূল্য মজুদ করে এবং দাম বাড়িয়ে দেন। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বাজারে অভাবের সময় পণ্য মজুদ করে রাখে ও অধিক লাভের আশায় তা বিক্রি করে সে বড় পাপী’ (মুসলিম)। সুতরাং আমাদের ব্যবসায়ী ভাইদের উচিত এই ফজিলতের মাসে তারা যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় মূল্যের দাম বৃদ্ধি এবং মজুদ না করেন।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে রমজানে বেশি বেশি নেক আমল করার এবং রমজানের মর্যাদা বজায় রাখার তৌফিক দান করুন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Robiul Islam

মাগফিরাত, রহমত ও নাজাতের মাস রমজান

আপডেট টাইম : 08:05:29 am, Saturday, 1 April 2023

ইসলাম ডেস্ক: পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে করে তোমরা মুত্তাকি হতে পার’ (সুরা বাকারা-১৮৩)। সুতরাং শুধু আমাদের ওপর নয়, আমাদের পূর্ববর্তী মানুষের ওপরও রোজা রাখা ফরজ ছিল। রোজা কী? শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নামই সাওম। তবে সুবেহ সাদিক উদয় হওয়ার পূর্ব থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সিয়ামের নিয়তে একাধারে এভাবেই বিরত থাকলেই তা সিয়াম বলে গণ্য হবে। সূর্যাস্তের ১ মিনিট আগেও যদি কিছু রোজাদার খেয়ে ফেলে, পান করে কিংবা স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হয় তাহলে সিয়াম বা রোজা হবে না। সিয়াম যদিও একটি কষ্টকর ইবাদত কিন্তু এর পুরস্কার অসীম।

তাকওয়ার শক্তি অর্জন করার ব্যাপারে সিয়ামের বিশেষ ভূমিকা বিদ্যমান। সিয়ামের মাধ্যমে প্রবৃত্তির তাড়না নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মুমিনের জীবনে রমজান হলো আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাস। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজা অন্যতম।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়, একটি নেকির সওয়াব ১০ গুণ থেকে ২৭ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কিন্তু রোজার প্রতিদান আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্যই নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে’ (মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ)। অন্য বর্ণনায় আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য, পক্ষান্তরে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব’ (বুখারি)।

জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন শুধু রোজাদার ব্যক্তিরাই এই দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। অন্য কেউ পারবে না। যে ব্যক্তি ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে সে জান্নাতের পানীয় পান করবে। সে কখনো পিপাসার্ত হবে না (মুসনাদে আহমাদ)।

এই পবিত্র মাসে আল্লাহ রব্বুল আলামিন রসুল (সা.)-এর ওপর পবিত্র কোরআন নাজিল করেন। মহাগ্রন্থ কোরআন মানবজাতির জন্য দিকনির্দেশনা। আল্লাহ বলেন, ‘রোজার মাস এমন একটি মাস যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, আর এ কোরআন হচ্ছে মানবজাতির পথের দিশা। সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন; হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে এ মাসটি পাবে সে রোজা রাখবে’ (সুরা বাকারা-১৮৫)।

সুরা আল কদরে আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই আমি এ গ্রন্থটি এক মর্যাদাপূর্ণ রাতে নাজিল করেছি। তুমি কি জানো সেই মর্যাদাপূর্ণ রাতটি কী? মর্যাদাপূর্ণ রাতটি হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম’ (আয়াত ১-৩) সুবহানাল্লাহ। সুতরাং এ মাসে আমাদের সবার বেশি বেশি কোরআন পাঠ করা উচিত।

সারা দিন রোজা রেখে সূর্যাস্তের পর পানাহারের মাধ্যমে রোজাদার তার উপবাস ভঙ্গ করেন। তাকেই ইফতার বলে। ইফতার শিগগিরই করা উত্তম। মহানবী (সা.) খেজুর আর পানি দিয়ে ইফতার করতেন। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি খুশি, একটি ইফতারের সময় অপরটি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়’ (মুসলিম)। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে তার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে এবং রোজাদারের সওয়াবের সমপরিমাণ সওয়াব সে লাভ করবে’ (মুসনাদে আহমাদ) সুবহানাল্লাহ। একজন রোজাদারের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

রমজান মাসে খতম তারাবি থেকে অংশ নেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রমজানের রাতে সাহাবিরা একসঙ্গে দুই রাকাত করে তারাবির নামাজ আদায় করতেন। দুই রাকাতের মাঝে তারা কিছুটা সময় বিশ্রাম নিতেন। এ জন্যই এই নামাজের নাম তারাবির নামাজ।

রমজানের শেষ দশকে মুমিন মুত্তাকি বান্দাদের জন্য রয়েছে এক বিশেষ রাত লাইলাতুল কদর। এই রাতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর ইমানদার ও রোজাদার বান্দাদের জন্য করুণাধারা বর্ষণ করেন। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘কদরের রাতে যে ব্যক্তি একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রাত জেগে ইবাদতে (নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, তসবিহ পাঠ) মশগুল থাকে তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়’ (বুখারি) সুবহানাল্লাহ। রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবেকদর অন্বেষণ করার জন্য রসুল (সা.) সাহাবাদের তাগিদ দিয়েছেন। এই রমজানে যত বেশি দান সদকা করা যায় ততই উত্তম। আমাদের মনে রাখতে হবে, রমজান হলো আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া এবং নিজের আত্মশুদ্ধির মাস। রমজান পাওয়ার পর যে নিজেকে পাপ মুক্ত করতে পারল না তার মতো হতভাগা আর কেউ নেই।

আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা লাভের আশায় রমজানে দ্রব্যমূল্য মজুদ করে এবং দাম বাড়িয়ে দেন। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বাজারে অভাবের সময় পণ্য মজুদ করে রাখে ও অধিক লাভের আশায় তা বিক্রি করে সে বড় পাপী’ (মুসলিম)। সুতরাং আমাদের ব্যবসায়ী ভাইদের উচিত এই ফজিলতের মাসে তারা যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় মূল্যের দাম বৃদ্ধি এবং মজুদ না করেন।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে রমজানে বেশি বেশি নেক আমল করার এবং রমজানের মর্যাদা বজায় রাখার তৌফিক দান করুন।