Dhaka , Tuesday, 23 April 2024

ইফতারের সময় দেশের কথা খুব মনে পড়ে

  • Robiul Islam
  • আপডেট টাইম : 08:36:07 am, Thursday, 6 April 2023
  • 43 বার

প্রবাস ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়ায় দুই হিসাবে রোজা রাখা হয়। প্রথমত বৈজ্ঞানিক পঞ্জিকা অনুসারে, যেদিন চাঁদের উদয় হয়। কিন্তু সেই চাঁদ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খালি চোখে দেখা যায় না। তাই দ্বিতীয়ত, চাঁদ দেখে রোজা রাখা হয়। বাংলাদেশিরা বেশিরভাগই দ্বিতীয় মতের অনুসারী। কারণ দেশে থাকতে সবাই এভাবেই রোজা এবং ঈদ করেছেন। এখনো অনেকের স্মৃতিতে ছোটবেলার চাঁদ দেখার স্মৃতি অনেক উজ্জ্বল। মনে হয় এইতো সেদিনের কথা।

মনে পড়ে আমাদের পাড়ার তেমাথায় সবাই জড়ো হতাম। কারণ সেখান থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে মিন্টুদের বাঁশ ঝাড়ের ঠিক ওপর দিয়ে চাঁদ দেখা যেত। সেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই হাজির হয়ে যেতাম। মিন্টুরা ছিল ব্রাহ্মণ। আমাদের পাড়ায় তখন মুসলমানরাই সংখ্যালঘু। বেশিরভাগই হিন্দু পরিবার। তার মধ্যে ব্রাহ্মণের পাশাপাশি ধোপা, পাল এমনকি বরগীরাও ছিল। ধোপা বাড়ির কর্তার (দাদির) কাছে থাকতো চন্দ্র পঞ্জিকা। কারণ তারা চন্দ্র পঞ্জিকা ধরে পূজা দিতেন। আমরা মাঝে মাঝে গিয়ে কর্তার কাছে থেকে নিশ্চিত হয়ে আসতাম সেদিন আসলেই চাঁদ উঠবে কি না।

কে সবার আগে চাঁদ দেখতে পারে সেটা নিয়ে আমাদের ছোটদের মনে চলতো এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা। চাঁদ দেখে আমরা সবাই দাবি করতাম আমিই সবার আগে চাঁদ দেখেছি। এরপর বড়দের আমরা দেখিয়ে দিতাম। ওই যে বাঁশের পাতাগুলো দুভাগ হয়ে আছে। ঠিক তার মাঝখানে চাঁদ উঠেছে। হুবহু ধান কাটা কাস্তের মতো সরু সেই চাঁদের হাসি। এরপর সেই হাসি ছড়িয়ে পড়তো আমাদের সবার মুখে।

মেঘলা আকাশ বা কোনো কারণে চাঁদ দেখা না গেলে মাগরিবের নামাজের পর আমরা হাজির হতাম আমাদের পাড়ার একমাত্র টেলিভিশনের সামনে। সালামদের বাড়ির সেই সাদাকালো ন্যাশনাল টেলিভিশনের খবরে আমাদের মনে রঙিন আনন্দের সঞ্চার হতো। টিভিতে ঘোষণা শোনার পর পাড়ার মসজিদের মাইকে আমাদের হুজুর মালেক চাচা জানিয়ে দিতে চাঁদ দেখার খবর।

প্রবাসের এই যান্ত্রিক জীবনেও আমাদের পরিবারে আমরা চাঁদ দেখার এই চলটা চালু রেখেছি। বাচ্চাদের একটু বাড়তি এবং প্রাকৃতিক আনন্দ দেওয়ার জন্য। আমি আগে থেকেই মেয়েকে বলে রাখি যেন সে বিকেল থেকেই পশ্চিম আকাশে নজর রাখে। আমিও মাঝে মাঝে অফিসের বাইরে এসে আকাশে তাকাই। যে আগে দেখে ফোন করে সে অন্যকে জানাই। এবার অফিস থেকে ফেরার পর সন্ধ্যা হতো ডে লাইট সেভিং এর জন্য। আমরা তাই বাড়তি কিছুটা সময় পেতাম।

এবার বুধবারে চাঁদ দেখতে পাওয়ার কথা। সেদিন আকাশ মেঘলা তাই আমরা বারবার উঁকি দিয়েও চাঁদের দেখা পাইনি। বৃহস্পতিবারও আকাশে মেঘ ছিল। কিন্তু যেহেতু সেদিন দেখা যাবেই। কারণ সেদিন ছিল বৈজ্ঞানিক পঞ্জিকা অনুসারে চাঁদের দ্বিতীয় দিন। আমরা বাসা থেকে বেরিয়ে কাছের ভিক্টোরিয়া পার্কে চলে গেলাম পশ্চিম আকাশটা পুরোপুরি দেখার জন্য। সন্ধ্যার অনেক পর পর্যন্ত থেকেও চাঁদের দেখা না পেয়ে বিফল মনোরথে ফিরে আসলাম আমরা। এরপর স্বপন ভাইয়ের মেসেজ থেকে জানলাম সেদিন তারাবি পড়তে হবে। পরেরদিন থেকে রোজা।

আমাদের বাসার খুব কাছেই অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম ওয়েলফেয়ার সেন্টার। সেখানেই এখন প্রতি রমজানে খতম তারাবি পড়া হয়। আমরা সবসময়ই একটু দেরি করে তারাবি পড়তে যায়। কারণ অনেকেই আট রাকাত পড়ার পর বের হয়ে আসেন। আমরা যাই ওই সময়। আমার সঙ্গে প্রায়শই আমাদের সাত বছরের ছেলে রায়ান যোগ দেয়। অবশ্য পুরোটা পড়তে পারে না। তখন মসজিদের চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়ে। আমি নামাজ শেষ করে ওকে জাগিয়ে নিয়ে বাসায় ফিরি। আমাদের গ্রামেও একসময় খতম তারাবি পড়ার চল শুরু হয়েছিল।

এক মাসের জন্য একজন হাফেজ আসতেন। গ্রামের সবাই চাঁদা দিয়ে তার বেতন দেওয়া হতো। এশার নামাজের সময় সালাম আগেই এসে আমাদের ডাকাডাকি শুরু করতো। এই তুরা এখনো অজু করিসনি? তাড়াতাড়ি আয়। আমরা দ্রুত অজু করে মসজিদের পথে পা বাড়াতাম। এরপর নামাজ শেষ করে আবারও একসাথে বাসায় ফেরা। প্রবাসেও আমরা তাই হেঁটে হেঁটে মসজিদে যাই কারণ বাসা থেকে মসজিদ মাত্র দশ মিনিটের হাঁটা পথ। নামাজে অনেকের সাথেই দেখা হয়ে যায়। কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও নাগরিক ব্যস্ততার কারণে যাদের সাথে বহুদিন দেখা হয় না। তারাও তাদের বাচ্চাদের নিয়ে আসে৷ ফলে মসজিদের সামনের খোলা জায়গাটা বাচ্চাদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

সেহরির সময় এবং ইফতারের সময় দেশের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। কারণ এখানে আজান দেওয়ার চল নেই। দেশে আমাদের পাড়ায় আমাদের মাতুব্বর মন্টু চাচার নেতৃত্বে সারা পাড়ার মানুষকে জাগিয়ে দেওয়া হয় সেহরি খেতে ওঠার জন্য। মসজিদে মালেক চাচাও ডেকে চলেন পাশাপাশি। সারা পাড়াতে একটা উৎসব উৎসব আমেজ। আব্বা সবার আগে উঠে আমাদেরকে জাগিয়ে দিতেন। এখন প্রবাসে মোবাইলের অ্যালার্মে আমি উঠি সবার আগে।

তারপর মেয়ে এবং মেয়ের মাকে জাগিয়ে দিই। ওরা উঠতে উঠতে আমি ফ্রিজ থেকে ভাত এবং দুধের ঢপ বের করে ফেলি। এরপর বাটিতে ভাত আর দুধ মিশিয়ে মাইক্রোওয়েভে এক মিনিট গরম করতে দিই। গরম হয়ে গেলে বের করে কলা চটকিয়ে ওদের খেতে দিই। এরপর সবাই মিলে একসাথে খেয়ে আবার ঘুম।

অফিস থেকে ফিরে আবার সবাই মিলে একসাথে ইফতার করা। এখানে অনেকেই বাসায় ইফতারি তৈরি করেন। আর যেদিন তাড়া থাকে সেদিন বাংলা দোকান বা রেস্তোরাঁ থেকে মুখরোচক ইফতার কিনে নিয়ে আসেন। আবার অনেকেই সপরিবারে রেস্তোরাঁতে যেয়েও ইফতার করেন। দলবেঁধে ইফতার করার আনন্দ বেশি তাই সবাই তাদের পরিচিতদের নিয়ে অন্ততঃপক্ষে একদিন হলেও রেস্তোরাতে ইফতার করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনও ইফতারের আয়োজন করে থাকে। কুষ্টিয়াতে আমাদের গ্রামে একসময় বিদ্যুৎ ছিল না।

তখন আমরা অপেক্ষা করতাম কখন কুষ্টিয়া শহরের রেনউইক কারখানা থেকে হুইসেল দেবে। সেই হুইসেল গড়াই পদ্মা পার হয়ে একসময় আমাদের কাছে পৌঁছালে আমরা ইফতার করতাম। এরপর শহরতলি বাড়াদীতে আসার পর মসজিদের আযান শুনেই ইফতার করা হতো। এখন প্রবাসে মোবাইলের বিভিন্ন ইসলামিক এপের অ্যালার্ম শুনে ইফতার করা হয়।

আমার মনে আছে রেডিওতে রমজান মাসে মাগরিবের নামাজের আগে কোরআন তেলাওয়াত প্রচার করা হতো। এরপর মাগরিবের আজান এবং দোয়ার পর হামদ নাথ প্রচার করা হতো। এ বছর থেকে আমরা তাই যেকদিন বাসায় সবাই একসাথে ইফতার করেছি সেকদিনই ইফতারের আগে আগে ইউটিউবে কাজী নজরুল ইসলামের সেইসব কালজয়ী হামদ নাথ ছেড়ে দিয়ে ইফতার তৈরি করতে থাকি।

এরপর সময় হলে সবাই একসাথে টেবিলে বসে ইউটিউবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেই বিখ্যাত আযান ছেড়ে দিয়ে ইফতারের জন্য খাবার মুখে দিই। এ যেন আমাদের ছোটবেলাটাকে আমাদের সন্তানদের মধ্যে ফিরিয়ে আনার একটা ছোট চেষ্টা। সাথে সাথে ওদের বলি আমাদের শৈশব কৈশোরের চাঁদ দেখা, তারাবী পড়া, সেহরি খাওয়া এবং ইফতার করার গল্প।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Robiul Islam

ইফতারের সময় দেশের কথা খুব মনে পড়ে

আপডেট টাইম : 08:36:07 am, Thursday, 6 April 2023

প্রবাস ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়ায় দুই হিসাবে রোজা রাখা হয়। প্রথমত বৈজ্ঞানিক পঞ্জিকা অনুসারে, যেদিন চাঁদের উদয় হয়। কিন্তু সেই চাঁদ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খালি চোখে দেখা যায় না। তাই দ্বিতীয়ত, চাঁদ দেখে রোজা রাখা হয়। বাংলাদেশিরা বেশিরভাগই দ্বিতীয় মতের অনুসারী। কারণ দেশে থাকতে সবাই এভাবেই রোজা এবং ঈদ করেছেন। এখনো অনেকের স্মৃতিতে ছোটবেলার চাঁদ দেখার স্মৃতি অনেক উজ্জ্বল। মনে হয় এইতো সেদিনের কথা।

মনে পড়ে আমাদের পাড়ার তেমাথায় সবাই জড়ো হতাম। কারণ সেখান থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে মিন্টুদের বাঁশ ঝাড়ের ঠিক ওপর দিয়ে চাঁদ দেখা যেত। সেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই হাজির হয়ে যেতাম। মিন্টুরা ছিল ব্রাহ্মণ। আমাদের পাড়ায় তখন মুসলমানরাই সংখ্যালঘু। বেশিরভাগই হিন্দু পরিবার। তার মধ্যে ব্রাহ্মণের পাশাপাশি ধোপা, পাল এমনকি বরগীরাও ছিল। ধোপা বাড়ির কর্তার (দাদির) কাছে থাকতো চন্দ্র পঞ্জিকা। কারণ তারা চন্দ্র পঞ্জিকা ধরে পূজা দিতেন। আমরা মাঝে মাঝে গিয়ে কর্তার কাছে থেকে নিশ্চিত হয়ে আসতাম সেদিন আসলেই চাঁদ উঠবে কি না।

কে সবার আগে চাঁদ দেখতে পারে সেটা নিয়ে আমাদের ছোটদের মনে চলতো এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা। চাঁদ দেখে আমরা সবাই দাবি করতাম আমিই সবার আগে চাঁদ দেখেছি। এরপর বড়দের আমরা দেখিয়ে দিতাম। ওই যে বাঁশের পাতাগুলো দুভাগ হয়ে আছে। ঠিক তার মাঝখানে চাঁদ উঠেছে। হুবহু ধান কাটা কাস্তের মতো সরু সেই চাঁদের হাসি। এরপর সেই হাসি ছড়িয়ে পড়তো আমাদের সবার মুখে।

মেঘলা আকাশ বা কোনো কারণে চাঁদ দেখা না গেলে মাগরিবের নামাজের পর আমরা হাজির হতাম আমাদের পাড়ার একমাত্র টেলিভিশনের সামনে। সালামদের বাড়ির সেই সাদাকালো ন্যাশনাল টেলিভিশনের খবরে আমাদের মনে রঙিন আনন্দের সঞ্চার হতো। টিভিতে ঘোষণা শোনার পর পাড়ার মসজিদের মাইকে আমাদের হুজুর মালেক চাচা জানিয়ে দিতে চাঁদ দেখার খবর।

প্রবাসের এই যান্ত্রিক জীবনেও আমাদের পরিবারে আমরা চাঁদ দেখার এই চলটা চালু রেখেছি। বাচ্চাদের একটু বাড়তি এবং প্রাকৃতিক আনন্দ দেওয়ার জন্য। আমি আগে থেকেই মেয়েকে বলে রাখি যেন সে বিকেল থেকেই পশ্চিম আকাশে নজর রাখে। আমিও মাঝে মাঝে অফিসের বাইরে এসে আকাশে তাকাই। যে আগে দেখে ফোন করে সে অন্যকে জানাই। এবার অফিস থেকে ফেরার পর সন্ধ্যা হতো ডে লাইট সেভিং এর জন্য। আমরা তাই বাড়তি কিছুটা সময় পেতাম।

এবার বুধবারে চাঁদ দেখতে পাওয়ার কথা। সেদিন আকাশ মেঘলা তাই আমরা বারবার উঁকি দিয়েও চাঁদের দেখা পাইনি। বৃহস্পতিবারও আকাশে মেঘ ছিল। কিন্তু যেহেতু সেদিন দেখা যাবেই। কারণ সেদিন ছিল বৈজ্ঞানিক পঞ্জিকা অনুসারে চাঁদের দ্বিতীয় দিন। আমরা বাসা থেকে বেরিয়ে কাছের ভিক্টোরিয়া পার্কে চলে গেলাম পশ্চিম আকাশটা পুরোপুরি দেখার জন্য। সন্ধ্যার অনেক পর পর্যন্ত থেকেও চাঁদের দেখা না পেয়ে বিফল মনোরথে ফিরে আসলাম আমরা। এরপর স্বপন ভাইয়ের মেসেজ থেকে জানলাম সেদিন তারাবি পড়তে হবে। পরেরদিন থেকে রোজা।

আমাদের বাসার খুব কাছেই অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম ওয়েলফেয়ার সেন্টার। সেখানেই এখন প্রতি রমজানে খতম তারাবি পড়া হয়। আমরা সবসময়ই একটু দেরি করে তারাবি পড়তে যায়। কারণ অনেকেই আট রাকাত পড়ার পর বের হয়ে আসেন। আমরা যাই ওই সময়। আমার সঙ্গে প্রায়শই আমাদের সাত বছরের ছেলে রায়ান যোগ দেয়। অবশ্য পুরোটা পড়তে পারে না। তখন মসজিদের চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়ে। আমি নামাজ শেষ করে ওকে জাগিয়ে নিয়ে বাসায় ফিরি। আমাদের গ্রামেও একসময় খতম তারাবি পড়ার চল শুরু হয়েছিল।

এক মাসের জন্য একজন হাফেজ আসতেন। গ্রামের সবাই চাঁদা দিয়ে তার বেতন দেওয়া হতো। এশার নামাজের সময় সালাম আগেই এসে আমাদের ডাকাডাকি শুরু করতো। এই তুরা এখনো অজু করিসনি? তাড়াতাড়ি আয়। আমরা দ্রুত অজু করে মসজিদের পথে পা বাড়াতাম। এরপর নামাজ শেষ করে আবারও একসাথে বাসায় ফেরা। প্রবাসেও আমরা তাই হেঁটে হেঁটে মসজিদে যাই কারণ বাসা থেকে মসজিদ মাত্র দশ মিনিটের হাঁটা পথ। নামাজে অনেকের সাথেই দেখা হয়ে যায়। কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও নাগরিক ব্যস্ততার কারণে যাদের সাথে বহুদিন দেখা হয় না। তারাও তাদের বাচ্চাদের নিয়ে আসে৷ ফলে মসজিদের সামনের খোলা জায়গাটা বাচ্চাদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

সেহরির সময় এবং ইফতারের সময় দেশের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। কারণ এখানে আজান দেওয়ার চল নেই। দেশে আমাদের পাড়ায় আমাদের মাতুব্বর মন্টু চাচার নেতৃত্বে সারা পাড়ার মানুষকে জাগিয়ে দেওয়া হয় সেহরি খেতে ওঠার জন্য। মসজিদে মালেক চাচাও ডেকে চলেন পাশাপাশি। সারা পাড়াতে একটা উৎসব উৎসব আমেজ। আব্বা সবার আগে উঠে আমাদেরকে জাগিয়ে দিতেন। এখন প্রবাসে মোবাইলের অ্যালার্মে আমি উঠি সবার আগে।

তারপর মেয়ে এবং মেয়ের মাকে জাগিয়ে দিই। ওরা উঠতে উঠতে আমি ফ্রিজ থেকে ভাত এবং দুধের ঢপ বের করে ফেলি। এরপর বাটিতে ভাত আর দুধ মিশিয়ে মাইক্রোওয়েভে এক মিনিট গরম করতে দিই। গরম হয়ে গেলে বের করে কলা চটকিয়ে ওদের খেতে দিই। এরপর সবাই মিলে একসাথে খেয়ে আবার ঘুম।

অফিস থেকে ফিরে আবার সবাই মিলে একসাথে ইফতার করা। এখানে অনেকেই বাসায় ইফতারি তৈরি করেন। আর যেদিন তাড়া থাকে সেদিন বাংলা দোকান বা রেস্তোরাঁ থেকে মুখরোচক ইফতার কিনে নিয়ে আসেন। আবার অনেকেই সপরিবারে রেস্তোরাঁতে যেয়েও ইফতার করেন। দলবেঁধে ইফতার করার আনন্দ বেশি তাই সবাই তাদের পরিচিতদের নিয়ে অন্ততঃপক্ষে একদিন হলেও রেস্তোরাতে ইফতার করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনও ইফতারের আয়োজন করে থাকে। কুষ্টিয়াতে আমাদের গ্রামে একসময় বিদ্যুৎ ছিল না।

তখন আমরা অপেক্ষা করতাম কখন কুষ্টিয়া শহরের রেনউইক কারখানা থেকে হুইসেল দেবে। সেই হুইসেল গড়াই পদ্মা পার হয়ে একসময় আমাদের কাছে পৌঁছালে আমরা ইফতার করতাম। এরপর শহরতলি বাড়াদীতে আসার পর মসজিদের আযান শুনেই ইফতার করা হতো। এখন প্রবাসে মোবাইলের বিভিন্ন ইসলামিক এপের অ্যালার্ম শুনে ইফতার করা হয়।

আমার মনে আছে রেডিওতে রমজান মাসে মাগরিবের নামাজের আগে কোরআন তেলাওয়াত প্রচার করা হতো। এরপর মাগরিবের আজান এবং দোয়ার পর হামদ নাথ প্রচার করা হতো। এ বছর থেকে আমরা তাই যেকদিন বাসায় সবাই একসাথে ইফতার করেছি সেকদিনই ইফতারের আগে আগে ইউটিউবে কাজী নজরুল ইসলামের সেইসব কালজয়ী হামদ নাথ ছেড়ে দিয়ে ইফতার তৈরি করতে থাকি।

এরপর সময় হলে সবাই একসাথে টেবিলে বসে ইউটিউবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেই বিখ্যাত আযান ছেড়ে দিয়ে ইফতারের জন্য খাবার মুখে দিই। এ যেন আমাদের ছোটবেলাটাকে আমাদের সন্তানদের মধ্যে ফিরিয়ে আনার একটা ছোট চেষ্টা। সাথে সাথে ওদের বলি আমাদের শৈশব কৈশোরের চাঁদ দেখা, তারাবী পড়া, সেহরি খাওয়া এবং ইফতার করার গল্প।