Dhaka , Monday, 17 June 2024

যুগে যুগে ফুটবলে বর্ণবাদ এবং যত করুণ পরিণতি

  • Robiul Islam
  • আপডেট টাইম : 08:11:43 am, Sunday, 28 May 2023
  • 51 বার

স্পোর্টস ডেস্ক: ইউরোপীয় ফুটবলে বর্ণবাদ এক অপ্রিয় এবং লজ্জাজনক সত্য। চাকচিক্যময়, উন্নত দেশগুলোর ফুটবলে বারবার বর্ণবাদ প্রথা উঁকি দিয়ে যেন সভ্যতার মুখে কালিমা মেখে দিয়েছে।

হালের ভিনিসিয়াস জুনিয়রের বর্ণবাদের শিকার হওয়া নিয়ে আবারও যেন উঠে এসেছে বর্ণবাদের কালো অধ্যায়।ভিনিসিয়াসের আগেও অনেক বিখ্যাত ফুটবলার বিপক্ষ দলের দর্শক, এমনকি নিজেদের দলের ভক্তদের থেকেও বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন।

বর্ণবাদ মূলত এক ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ। যদিও বর্ণবাদের সঙ্গে গায়ের রঙ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তবে বর্ণবাদ শুধু গায়ের রঙের কারণেই নয়, বরং লিঙ্গ, ধর্ম, এমনকি জাতীয়তার কারণেও হতে পারে। আফ্রিকান এবং দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলার যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে, ইউরোপীয় ফুটবলে দাপটের সঙ্গে খেলে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়া, তারা প্রায়ই সেখানে তাদের কালো এবং বাদামি চামড়া এবং জাতীয়তার কারণে বর্ণবাদের শিকার হন।

এই ধরনের বর্ণবাদী আচরণের কারণে জার্মানির মুসলিম ফুটবলার মেসুত ওজিল তার আন্তর্জাতিক এবং ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের ইতি টেনেছেন অসময়েই। জার্মানির হয়ে ৯২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নেয়া এই ফুটবলার ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এতকিছুর পরেও শুধু তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম হওয়ার কারণে বারবার বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা যখন ম্যাচ জিতি তখন আমি একজন জার্মান, কিন্তু আমরা যখন ম্যাচ হারি, তখনই আমি হয়ে যাই একজন তুর্কি অভিবাসী।

ইন্টার মিলানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার রোমেরো লুকাকুর গল্পও অনেকটা একইরকম। কঙ্গো বংশোদ্ভূত এই বেলজিয়ান ফুটবলারও বারবার বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন। ভালো সময়ে সমর্থকেরা সমর্থন দিয়েছেন কিন্তু অফ ফর্ম আসলে তাকে নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনার চেয়ে বর্ণবাদী আচরণই হয়েছে বেশি।

রিয়াল মাদ্রিদের স্ট্রাইকার এবং বর্তমান ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকা করিম বেনজেমাও বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন। গোল করলে তিনি একজন ফরাসি কিন্তু অফ ফর্মে গেলেও তাকে দেখা হয়েছে একজন আরব হিসেবে।

ইউরোপীয় ফুটবলে সবচেয়ে বেশি বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন বোধহয় ইতালিয়ান ফুটবলার মারিও বালোতেল্লি। নিজের খামখেয়ালিপনা এবং পাগলাটে স্বভাবের জন্য ক্যারিয়ারের যতটা ক্ষতি হয়েছে, ঠিক ততটাই তার ক্যারিয়ার ধসের পিছনে প্রভাব ফেলেছে বর্ণবাদ। ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলা এই ফুটবলার বারবার গায়ের রঙের কারণে তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছেন। বিপক্ষ দল, নিজের দল উভয় জায়গা থেকেই পেয়েছেন বাজে আচরণ। কখনো গোল করে বর্ণবাদের জবাব দিয়েছেন, আবার কখনো কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছেন। বর্ণবাদী মন্তব্যের শিকার হওয়ার কারণেই ক্যারিয়ার বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেননি এই প্রতিভাবান ফুটবলার।

সাম্প্রতিক সময়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের বারবার এই বর্ণবাদের শিকার হওয়া নিয়ে যেন ঝড় উঠেছে ফুটবল বিশ্বে। বিভিন্ন ফুটবলার, এমনকি ফিফা প্রেসিডেন্টও পাশে দাঁড়িয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকার পক্ষে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ফুটবল ভক্তরা বর্ণবাদের সমালোচনা জানিয়েছেন।

বর্ণবাদী আচরণ এক ধরনের মানসিক রোগ। কিছু ফুটবল ভক্তের এই আচরণগত সমস্যার কারণেই বারবার বর্ণবাদের শিকার হন ফুটবলাররা। এই ধরনের আচরণ এক ধরনের অপরাধও বটে। ভিনিসিয়াসের ঘটনায় যেমন লা লীগা মায়োর্কার একটি আদালতে অভিযোগ দায়ের করেছে। কঠোর আইনের প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক শিষ্টাচার গঠনের মাধ্যমেই বর্ণবাদ প্রথা নির্মূল করা সম্ভব। কোনো অবস্থাতেই এই ধরনের তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে যেন কোনো ফুটবলারের ক্যারিয়ারের ক্ষতি না হয়, সেজন্যও ফিফার কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Robiul Islam

জনপ্রিয় সংবাদ

যুগে যুগে ফুটবলে বর্ণবাদ এবং যত করুণ পরিণতি

আপডেট টাইম : 08:11:43 am, Sunday, 28 May 2023

স্পোর্টস ডেস্ক: ইউরোপীয় ফুটবলে বর্ণবাদ এক অপ্রিয় এবং লজ্জাজনক সত্য। চাকচিক্যময়, উন্নত দেশগুলোর ফুটবলে বারবার বর্ণবাদ প্রথা উঁকি দিয়ে যেন সভ্যতার মুখে কালিমা মেখে দিয়েছে।

হালের ভিনিসিয়াস জুনিয়রের বর্ণবাদের শিকার হওয়া নিয়ে আবারও যেন উঠে এসেছে বর্ণবাদের কালো অধ্যায়।ভিনিসিয়াসের আগেও অনেক বিখ্যাত ফুটবলার বিপক্ষ দলের দর্শক, এমনকি নিজেদের দলের ভক্তদের থেকেও বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন।

বর্ণবাদ মূলত এক ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ। যদিও বর্ণবাদের সঙ্গে গায়ের রঙ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তবে বর্ণবাদ শুধু গায়ের রঙের কারণেই নয়, বরং লিঙ্গ, ধর্ম, এমনকি জাতীয়তার কারণেও হতে পারে। আফ্রিকান এবং দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলার যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে, ইউরোপীয় ফুটবলে দাপটের সঙ্গে খেলে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়া, তারা প্রায়ই সেখানে তাদের কালো এবং বাদামি চামড়া এবং জাতীয়তার কারণে বর্ণবাদের শিকার হন।

এই ধরনের বর্ণবাদী আচরণের কারণে জার্মানির মুসলিম ফুটবলার মেসুত ওজিল তার আন্তর্জাতিক এবং ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের ইতি টেনেছেন অসময়েই। জার্মানির হয়ে ৯২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নেয়া এই ফুটবলার ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এতকিছুর পরেও শুধু তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম হওয়ার কারণে বারবার বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা যখন ম্যাচ জিতি তখন আমি একজন জার্মান, কিন্তু আমরা যখন ম্যাচ হারি, তখনই আমি হয়ে যাই একজন তুর্কি অভিবাসী।

ইন্টার মিলানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার রোমেরো লুকাকুর গল্পও অনেকটা একইরকম। কঙ্গো বংশোদ্ভূত এই বেলজিয়ান ফুটবলারও বারবার বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন। ভালো সময়ে সমর্থকেরা সমর্থন দিয়েছেন কিন্তু অফ ফর্ম আসলে তাকে নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনার চেয়ে বর্ণবাদী আচরণই হয়েছে বেশি।

রিয়াল মাদ্রিদের স্ট্রাইকার এবং বর্তমান ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকা করিম বেনজেমাও বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন। গোল করলে তিনি একজন ফরাসি কিন্তু অফ ফর্মে গেলেও তাকে দেখা হয়েছে একজন আরব হিসেবে।

ইউরোপীয় ফুটবলে সবচেয়ে বেশি বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন বোধহয় ইতালিয়ান ফুটবলার মারিও বালোতেল্লি। নিজের খামখেয়ালিপনা এবং পাগলাটে স্বভাবের জন্য ক্যারিয়ারের যতটা ক্ষতি হয়েছে, ঠিক ততটাই তার ক্যারিয়ার ধসের পিছনে প্রভাব ফেলেছে বর্ণবাদ। ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলা এই ফুটবলার বারবার গায়ের রঙের কারণে তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছেন। বিপক্ষ দল, নিজের দল উভয় জায়গা থেকেই পেয়েছেন বাজে আচরণ। কখনো গোল করে বর্ণবাদের জবাব দিয়েছেন, আবার কখনো কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছেন। বর্ণবাদী মন্তব্যের শিকার হওয়ার কারণেই ক্যারিয়ার বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেননি এই প্রতিভাবান ফুটবলার।

সাম্প্রতিক সময়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের বারবার এই বর্ণবাদের শিকার হওয়া নিয়ে যেন ঝড় উঠেছে ফুটবল বিশ্বে। বিভিন্ন ফুটবলার, এমনকি ফিফা প্রেসিডেন্টও পাশে দাঁড়িয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকার পক্ষে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ফুটবল ভক্তরা বর্ণবাদের সমালোচনা জানিয়েছেন।

বর্ণবাদী আচরণ এক ধরনের মানসিক রোগ। কিছু ফুটবল ভক্তের এই আচরণগত সমস্যার কারণেই বারবার বর্ণবাদের শিকার হন ফুটবলাররা। এই ধরনের আচরণ এক ধরনের অপরাধও বটে। ভিনিসিয়াসের ঘটনায় যেমন লা লীগা মায়োর্কার একটি আদালতে অভিযোগ দায়ের করেছে। কঠোর আইনের প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক শিষ্টাচার গঠনের মাধ্যমেই বর্ণবাদ প্রথা নির্মূল করা সম্ভব। কোনো অবস্থাতেই এই ধরনের তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে যেন কোনো ফুটবলারের ক্যারিয়ারের ক্ষতি না হয়, সেজন্যও ফিফার কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিত।