Dhaka , Thursday, 24 September 2026
শিরোনাম :
বৈধ বিদেশযাত্রা হোক সহজ, বন্ধ হোক অযথা হয়রানি বাংলায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রবাসীদের সাবধান করল সৌদি মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং শোকেসে অংশ নিয়েছে প্রাণ মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে হাইকমিশনারের মতবিনিময় ইরাকের নয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন শিয়া আল- সুদানি পোস্টাল ভোটিং: প্রবাসীদের নিবন্ধনের সময় ৫ দিন—কোন দেশে কবে শুরু? বাহরাইন প্রবাসীদের জন্য সচেতনতামূলক মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্প দক্ষিণ আফ্রিকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশিসহ নিহত ১১, আহত ৩১ লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবি, নিহতদের সবাই বাংলাদেশি ‘প্রবাসীর ভোট প্রদান সহজ করা না হলে ভোটাধিকার মূল্যহীন’

যুদ্ধের ধাক্কায় চাপে পড়তে পারে প্রবাসী আয়

ইরানে ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে অস্থির হয়ে উঠেছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে প্রবাসী আয়ের ওপর চাপ। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেশ বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

তাদের মতে, সরাসরি সামরিক প্রভাবের চেয়ে জ্বালানি, শ্রমবাজার ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে পরোক্ষ অভিঘাতই বড় ঝুঁকি। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা, রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

 

সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে তেলের পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহেও সংকট তৈরি হতে পারে। কাতার থেকে গ্যাসবাহী ট্যাংকার চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও।

 

তিনি বলেন, প্রথম ও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। ফলে আমদানি-রপ্তানির খরচ বৃদ্ধি পায় এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। এতে এক ধরনের ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ তৈরি হয়ে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়তে পারে। রমজানকে ঘিরে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হলে মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।

 

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় ইউরোপে গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাইমন মহসীন বলেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী বা বিস্তৃত হলে বাংলাদেশের জন্য প্রধান ঝুঁকি হবে জ্বালানিনির্ভরতা। আমদানিনির্ভর তেলের দাম স্থায়ীভাবে বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি, ভর্তুকির চাপ এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে।

 

তার মতে, লোহিত সাগর বা উপসাগরীয় নৌপথে ঝুঁকি বাড়লে সামুদ্রিক বিমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা রপ্তানি খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত থাকায় তাদের যাতায়াতও বিঘ্নিত হচ্ছে। নতুন কর্মীরা কাজে যোগ দিতে পারছেন না। ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে কর্মরত দুই বাংলাদেশি নিহত এবং সাতজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

 

কূটনীতিকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে। এতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স কমার ঝুঁকি তৈরি হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের রপ্তানিও কমে যেতে পারে।

 

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হলে তা ব্যবস্থাপনাযোগ্য থাকবে। তবে দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব কয়েক মাস পর দৃশ্যমান হতে পারে।

 

বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। এ কারণে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও পূর্ব ইউরোপসহ বিকল্প শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি সরাসরি সামরিক নয়; বরং বাজার, অভিবাসন ও জনমতের মাধ্যমে আসা পরোক্ষ অভিঘাত। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে ঢাকার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Rahman

সমুদ্রপথে ইউরোপযাত্রা: ৯ মাসে ২ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী মৃত-নিখোঁজ

যুদ্ধের ধাক্কায় চাপে পড়তে পারে প্রবাসী আয়

আপডেট টাইম : 05:15:22 pm, Tuesday, 3 March 2026

ইরানে ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে অস্থির হয়ে উঠেছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে প্রবাসী আয়ের ওপর চাপ। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেশ বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

তাদের মতে, সরাসরি সামরিক প্রভাবের চেয়ে জ্বালানি, শ্রমবাজার ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে পরোক্ষ অভিঘাতই বড় ঝুঁকি। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা, রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

 

সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে তেলের পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহেও সংকট তৈরি হতে পারে। কাতার থেকে গ্যাসবাহী ট্যাংকার চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও।

 

তিনি বলেন, প্রথম ও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। ফলে আমদানি-রপ্তানির খরচ বৃদ্ধি পায় এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। এতে এক ধরনের ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ তৈরি হয়ে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়তে পারে। রমজানকে ঘিরে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হলে মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।

 

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় ইউরোপে গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাইমন মহসীন বলেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী বা বিস্তৃত হলে বাংলাদেশের জন্য প্রধান ঝুঁকি হবে জ্বালানিনির্ভরতা। আমদানিনির্ভর তেলের দাম স্থায়ীভাবে বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি, ভর্তুকির চাপ এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে।

 

তার মতে, লোহিত সাগর বা উপসাগরীয় নৌপথে ঝুঁকি বাড়লে সামুদ্রিক বিমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা রপ্তানি খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত থাকায় তাদের যাতায়াতও বিঘ্নিত হচ্ছে। নতুন কর্মীরা কাজে যোগ দিতে পারছেন না। ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে কর্মরত দুই বাংলাদেশি নিহত এবং সাতজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

 

কূটনীতিকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে। এতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স কমার ঝুঁকি তৈরি হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের রপ্তানিও কমে যেতে পারে।

 

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হলে তা ব্যবস্থাপনাযোগ্য থাকবে। তবে দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব কয়েক মাস পর দৃশ্যমান হতে পারে।

 

বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। এ কারণে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও পূর্ব ইউরোপসহ বিকল্প শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি সরাসরি সামরিক নয়; বরং বাজার, অভিবাসন ও জনমতের মাধ্যমে আসা পরোক্ষ অভিঘাত। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে ঢাকার প্রধান চ্যালেঞ্জ।