প্যারিস বললেই চোখে ভেসে ওঠে আইফেল টাওয়ারের আলো কিংবা ল্যুভর মিউজিয়ামের চত্বর। কিন্তু আপনি যদি ভালোবাসার এই শহরের আসল মেজাজ এবং তার ধমনিতে বইতে থাকা ইতিহাস আর আভিজাত্যকে সত্যি সত্যি অনুভব করতে চান, তবে আপনাকে আসতেই হবে প্যারিসের ‘প্যলে গার্নিয়ে’।
প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো এই অপেরা হাউসটির সামনে দাঁড়াতেই এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। আর ভেতরে পা রাখলে প্রথম যে অনুভূতিটা ভেতরে দোলা দেয় তা হলো, মানুষের হাত কিভাবে এত সুন্দর আর সূক্ষ্ম ভাস্কর্য গড়ে তুলতে পারে!
প্যারিসের ৯ নম্বর অ্যারোন্ডিসমেন্টে অবস্থিত এই সুবিশাল ভবনটি শুধু ইট-পাথরের শুধু নির্জীব স্থাপত্য নয়, এটি প্রকৃতপক্ষে ফরাসি সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। এই রাজকীয় রূপের পেছনে অবশ্য লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস। ১৮৬১ সালে তৎকালীন ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন চাইলেন এমন এক অপেরা হাউস তৈরি করতে, যা পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবে।
যেমন ঘোষণা তেমন কাজ। নকশা বাছাইয়ের জন্য আয়োজন করা হয় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, যেখানে নামি-দামি সব স্থপতিকে পেছনে ফেলে বাজিমাত করেন এক তরুণ ও একেবারেই অখ্যাত স্থপতি শার্ল গার্নিয়ে। তাঁর নামেই পরবর্তী সময়ে এই স্থাপত্যের নামকরণ করা হয়।
তবে রূপকথার মতো এই ভবনটি গড়ে তোলার পথটা খুব একটা মসৃণ ছিল না।
ফরাসি-প্রুশীয় যুদ্ধ, রাজতন্ত্রের পতন আর রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ধাক্কায় বারেবারে বন্ধ হয়েছে মহাস্থাপত্যের কাজ। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ধাপে তার পূর্ণাঙ্গ রূপ নেওয়ার পর ১৮৭৫ সালের ৫ জানুয়ারি বড় উৎসবের আমেজে আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয় প্যলে গার্নিয়ের মূল ফটক।
বাইরে দাঁড়িয়ে চোখ মেললে প্রথমেই স্বাগত জানায় ধাপে ধাপে সাজানো মার্বেল পাথরের স্তম্ভ, গ্রিক দেব-দেবীর অলঙ্করণ আর মোৎসার্ট, বিথোভেন, বাখের মতো দিকপাল সুরকারদের ব্রোঞ্জের মূর্তি। আর ভবনের একেবারে চূড়ায় সোনালি রঙের ‘অ্যাপোলো’র ভাস্কর্যটি যখন বিকেলের নরম রোদ গায়ে মাখে তখন চারপাশটায় যেন এক স্বর্গীয় আলো ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু বহিরাংশের সৌন্দর্য পার হয়ে ভেতরের মূল ফটক গলিয়ে প্রবেশপথ অতিক্রম করতেই চোখ ছানাবড়া করে দেয় বিশ্বখ্যাত ‘গ্র্যান্ড স্টেয়ারকেস’ বা বিশাল সিঁড়িঘর।
সাদা, সবুজ আর গাঢ় লাল মার্বেল পাথরের অপূর্ব সমন্বয়ে তৈরি এই সিঁড়িটিতে উঠলে মনে হবে আপনি হঠাৎ করেই কোনো রাজকীয় সিনেমার দৃশ্যে ঢুকে পড়েছেন। উনিশ শতকে প্যারিসের অভিজাতরা শুধু গান শুনতেই এখানে আসতেন না ; ইতিহাস থেকে নিজেদের দামি পোশাক, অলংকার আর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা জাহির করারও বড় একটা মঞ্চ ছিল এই সিঁড়িটি।
সিঁড়ি বেয়ে একটু ওপরের দিকে এগোলেই চোখে পড়ে ‘গ্র্যান্ড ফয়্যার’। ৫৪ মিটার লম্বা বিশাল এই হলঘরটিতে ঢুকলে মনে হবে আপনি যেন মুহূর্তের মধ্যে চলে গেছেন ভার্সাই প্রাসাদের সেই বিখ্যাত ‘হল অব মিরর’-এ। সোনায় মোড়ানো দেয়াল, মাথার ওপর ঝুলতে থাকা সুবিশাল ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি আর সিলিংয়ের চিত্রকর্মগুলোর সামনে দাঁড়ালে পলক ফেলা কঠিন হয়ে পড়ে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সুদূর ইউরোপের এই রাজকীয় জাঁকজমকের মাঝে দাঁড়িয়েও কেমন যেন একটা চেনা অনুভূতি খুঁজে পাওয়া যায়। আমাদের লালন শাহ এর আখড়া কিংবা সিলেটের শাহ জালালের দরগার ভাববাদী সংস্কৃতির ভেতর যে এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তি লুকিয়ে থাকে; ঠিক সেই শিল্পচেতনারই এক সোনালি ইউরোপীয় রূপ ফুটে উঠেছে গার্নিয়ের দেয়ালে দেয়ালে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফরাসি শিল্পকলার প্রেমে পড়েছিলেন এমনি এমনি নয় কিংবা আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে মুক্ত শিল্পসত্তার কথা বলেছিলেন, তারই এক বিশ্বজনীন সুর যেন প্রতিধ্বনিত হয় এই অডিটরিয়ামের কোনায় কোনায়।
এই নান্দনিক সৌন্দর্যের অন্তরালে আবার লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চও। বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ও মিউজিক্যাল ‘দ্য প্যান্টম অব দ্য অপেরা’র কথা আমরা অনেকেই জানি। ফরাসি লেখক গাস্তঁ লেরু কিন্তু কোনো কাল্পনিক জায়গা ভেবে এই গল্প লেখেননি; তাঁর মূল অনুপ্রেরণাই ছিল এই অপেরা হাউস।
প্রকৃতপক্ষে ভবনটির ভিত্তি মজবুত রাখতে এর একেবারে নিচে তৈরি করা হয়েছিল এক সুবিশাল ভূগর্ভস্থ জলাধার। আর সেই গোপন জলাধার থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘অপেরার ভূতের’ কাল্পনিক লেকের রহস্য। এমনকি ১৮৯৬ সালে পারফর্ম্যান্স চলাকালীন সত্যি সত্যিই সিলিং থেকে বিশাল এক ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি নিচে পড়ে এক দর্শকের মৃত্যু হয়েছিল, যে ঘটনা পরবর্তী সময়ে উপন্যাসের সবচেয়ে থ্রিলিং দৃশ্য হিসেবে জায়গা পায়।
রহস্যের এই চাদর সরিয়ে মূল থিয়েটারের ভেতর নজর দিলে দেখতে পাবেন লাল ভেলভেটের নরম আসন আর সোনালি অলঙ্করণের এক বিশাল রাজকীয় মিলনায়তন। প্রায় দুই হাজার দর্শক একসঙ্গে বসে পারফর্ম্যান্স দেখার মতো জায়গা এটি। ১৯৬৪ সালে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী মার্ক শাগাল এই থিয়েটারের সিলিংয়ে ২৪০ বর্গমিটারের বিশাল এক আধুনিক চিত্রকর্ম আঁকেন। মোৎসার্ট থেকে শুরু করে চাভকোভস্কির মতো মহান সুরকারদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আঁকা এই রঙিন ক্যানভাসটি ক্লাসিক্যাল নকশার ভবনে এনে দিয়েছে এক অন্যরকম আধুনিক মাত্রা।
আজও প্যলে গার্নিয়ের মঞ্চে নিয়মিত বিশ্বমানের ব্যালে নাচ আর অপেরা পরিবেশিত হয়। প্রতিদিন পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসেন শুধু এই শিল্পকর্মটি ছুঁয়ে দেখতে।
সিলেটের হাছন রাজা কিংবা রাধারমণের মরমি গান যেভাবে মানুষের রুহ বা আত্মাকে তোলপাড় করে, ঠিক তেমনি প্যারিসের এই অপেরা থিয়েটারের সুরও পশ্চিমের মানুষের একইভাবে হৃদয়কে দোলা দেয়। পাথর, সোনা, কাচ আর রং দিয়ে গড়া এই প্রাসাদ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—স্থান, কাল বা ভাষা যা-ই হোক না কেন, শিল্পের আবেগ সব দেশের, সব মানুষের জন্যই এক ও অভিন্ন।

প্রবাস ডেস্ক 

















