শরতের আগমনে উত্তরের নদ-নদীর চরাঞ্চল ছেয়ে গেছে ধবধবে সাদা কাশফুলে। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের জেগে ওঠা চরজুড়ে কাশফুলের এমন বিস্তার তৈরি করেছে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য। নদের বুকে জেগে ওঠা সবুজের মধ্যে সাদা কাশফুল যেন প্রকৃতির বুকে বিছিয়ে দিয়েছে শুভ্রতার চাদর।
শরতের নীল আকাশ আর বিকেলের মৃদু বাতাসে কাশফুলের দোল খাওয়ার দৃশ্য সহজেই আকৃষ্ট করছে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের। দূর থেকে চরাঞ্চলগুলোকে মনে হচ্ছে শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো জীবন্ত ছবি। কাছে গেলে দেখা যায়, সবুজ ঘাসের মধ্যে মাথা উঁচু করে বাতাসে দুলছে পালকের মতো নরম কাশফুল।
স্থানীয়রা জানান, নদীর পাড়ে জেগে ওঠা চরগুলোর শত শত বিঘা জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই কাশফুলের বিস্তার ঘটেছে। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকায় বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। কেউ আসছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে, কেউ প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে সময় কাটাতে, আবার কেউ ছুটে আসছেন মনোরম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে।
সরেজমিনে ইসলামপুর চরে গিয়ে দেখা যায়, কাশফুল দেখতে আসা মানুষের বেশ জমজমাট উপস্থিতি। দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সাত বন্ধু মিলে সেখানে ‘কাশফুলের ঘাট’ নামে একটি ক্যাফে চালু করেছেন। তাদের মধ্যে শ্রাবণ ও গাজী জানান, প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ কাশফুলের বন দেখতে আসেন। চরে সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকায় দর্শনার্থীদের কথা বিবেচনা করে তারা দোকানটি দিয়েছেন। সেখানে বোতলজাত পানি, কোমল পানীয়, ফুচকাসহ বিভিন্ন খাবার পাওয়া যায়। দুপুরের পর থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে ক্রেতাদের আনাগোনা থাকে।
ভূরুঙ্গামারী সদর উপজেলার বাগভান্ডার গ্রামের দম্পতি মো. আরিফ ও তাহমিনা কাশফুল দেখতে ইসলামপুর চরে এসেছেন। তারা জানান, বিস্তীর্ণ চরজুড়ে কাশফুলের নয়নাভিরাম দৃশ্য তাদের মুগ্ধ করেছে।
চরে বেড়াতে আসা মাছুমা খন্দকার বলেন, ‘কাশফুলের সমারোহে বিকেলের বাতাসে যেন শীতের আগমনের বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে শৈশবের অনেক স্মৃতিও মনে পড়ে যাচ্ছে। এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’
স্থানীয় আব্দুল কাদের জানান, তার তিন বিঘা জমিতে কাশফুল জন্মেছে। কাশ ও ছন বিক্রি করে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করার আশা করছেন তিনি। তার ভাষ্য, কাশের গোড়ার অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একসময় ঘরের চালা ও বেড়া, পানের বরজ এবং বাগানের বেড়া তৈরিতেও কাশ ও ছনের ব্যাপক ব্যবহার ছিল।
তিস্তা ব্যারেজের ভাটিতেও দেখা গেছে কাশফুলের বিস্তৃত শুভ্রতা। সেখানে ঘুরতে আসা নাহিদ ও সাদিয়া জানান, ধবধবে সাদা কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতেই তারা এখানে এসেছেন। হিমেল বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুলের দৃশ্য তাদের মুগ্ধ করেছে।
প্রকৃতিপ্রেমীরা মনে করেন, নদীর তীর, চরাঞ্চল ও অনাবাদি জমি সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে কাশফুলের বিস্তার আরও বাড়তে পারে। এতে যেমন চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে, তেমনি কাশ ও ছন স্থানীয় মানুষের জন্য বাড়তি আয়ের উৎসও হতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. এস এম আবু বক্কর সাইফুল ইসলাম বলেন, কাশফুল কোনো ধরনের বিশেষ পরিচর্যা ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে। এ কারণে উত্তরের আট জেলার ৭৮০টি চরের কত জমিতে কাশফুল রয়েছে, তার নির্দিষ্ট তথ্য দপ্তরে সংরক্ষিত নেই। তবে কাশফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না; কৃষিকাজসহ নানা প্রয়োজনে এর ব্যবহার রয়েছে এবং এটি স্থানীয় মানুষের আয়েরও একটি উৎস হতে পারে।

প্রবাসীর কথা ডেস্ক 

















