বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য বহু দেশের ভিসা পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নেতিবাচক আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি, জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গ এবং ভারতে ভিসা ‘বন্ধ’ হয়ে যাওয়াসহ একাধিক কারণে বিভিন্ন দেশ ভিসা নীতিতে কঠোরতা বাড়িয়েছে। সম্প্রতি ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে ভিসা না পাওয়া নাগরিকেরা এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্যে এসব কারণ উঠে এসেছে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: অর্থ, যোগ্যতা বা ভ্রমণ ইতিহাস— কিছুই ভিসা নিশ্চিত করছে না
স্থপতি মো. মারুফ হাসান জানান, কানাডা ও তুরস্কে ভিসার আবেদন করেও তিনি দুই জায়গা থেকেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তার ভাষায়, “মনে হচ্ছে সবাই ভাবছে, আমরা বিদেশে গিয়ে আর ফিরবো না। ব্যাংকে ৬০ লাখ টাকা ব্যালান্স দেখানোর পরও বলছে অর্থ অপর্যাপ্ত। এটা ভিসা না দেওয়ার অজুহাত ছাড়া আর কিছুই নয়।”
এমিরেটস এয়ারলাইন্স কর্মকর্তা আজমাইন আশরাফ বলেন, পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলেও দূতাবাস তাকে ভিসা দেয়নি। “সেদিন দূতাবাসে থাকা ৪০–৪৫টি পরিবারকেও ভিসা দেওয়া হয়নি,” জানান তিনি।
স্বর্ণকুটির ডেভেলপারের চেয়ারম্যান প্রদীপ চন্দ্র নন্দীর অভিজ্ঞতাও একই। তিনি জানান, ব্যাপক আর্থিক সক্ষমতা, ৪০টির বেশি দেশে ভ্রমণ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও লন্ডনের ভিসা পাননি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে মূল কারণ
সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক সংকেত পাঠাচ্ছে। ভারতে ভিসা বন্ধ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তার ভাষায়, “প্রতিবেশী দেশ ভিসা বন্ধ করলে বিশ্বে খারাপ বার্তা যায়। মনে করা হয় ভেতরে নিশ্চয়ই বড় সমস্যা আছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, জঙ্গিবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও অনেক দেশের কঠোর অবস্থানের কারণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ন হ মুনিরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানবপাচারের অভিযোগও বড় কারণ। “বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলেই অনেক দেশ সতর্ক হয়। কেউ কেউ ভিসা দিচ্ছে না, যারা দিচ্ছে— তাদের কাছেও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে,” বলেন তিনি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সমস্যা
ব্র্যাকের অভিবাসন প্রোগ্রামের পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে— বাংলাদেশিরা সুযোগ পেলেই দেশ ছাড়তে চান। ট্যুরিস্ট বা মেডিকেল ভিসা নিয়েও অনেকেই অন্য উদ্দেশ্যে বিদেশে অবস্থান করেন। তার মতে, “এই ধারণা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর মূল কারণ দেশে সুশাসনের অভাব।”
ট্রাভেল ব্যবসায়ী অজিত কুমার সাহা বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর বিদেশে ‘mass outflow’-এর গুজব, এবং পাসপোর্ট যাচাইকরণ শিথিল হওয়ায় রোহিঙ্গাদের হাতে পাসপোর্ট পৌঁছে— এসব কারণে অনেক দেশ সন্দেহপ্রবণ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশিদের ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর হয়ে গেছে।
কোন কোন দেশ ভিসা দিচ্ছে না বা কঠোরতা বাড়িয়েছে?
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (ATAB) সভাপতি রাফিউজ্জামান রাফি বলেন—ইতোমধ্যে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান, কাতার, ভিয়েতনাম, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না।
থাইল্যান্ড ভিসা দিলেও প্রক্রিয়ায় ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় নিচ্ছে।
সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জাপান উল্লেখযোগ্যভাবে কম ভিসা দিচ্ছে।
তার ভাষায়, “মনে হচ্ছে আমাদের পাসপোর্টের মান তলানিতে নেমে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে আমরা ভিসার অপব্যবহার করেছি— সে কারণেও দেশগুলো কঠোর হয়েছে।”

প্রবাসীর কথা ডেস্ক 



















