বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় কর্মসূত্রে সৌদি আরবে সর্বাধিক সংখ্যক বাংলাদেশি অবস্থান করেন। কৃষিকাজ, নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, সেবা–—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করে তুলছেন। তাদের কাতারেই রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীর মতো দক্ষ পেশাজীবীরাও।
সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সিংহভাগই সাধারণ শ্রমিক। নারীরাও গৃহকর্মীসহ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত আছেন। বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতা খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।
দুঃখজনক হলো—দক্ষ কর্মী রপ্তানির জন্য দেশে এখনো শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে অদক্ষ কর্মীরা মরুর দেশে কঠোর শ্রম দিয়ে খুব কম বেতনে কাজ করেও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। তাদের দুর্ভোগের শুরু হয় বাংলাদেশ থেকেই। বিভিন্ন দালালচক্রের প্রতারণা, অস্বাভাবিক পরিমাণ টাকা দিয়ে ভিসা ক্রয়, ধার–দেনায় জর্জরিত হয়ে সৌদিতে গিয়ে দেখে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার বিশাল ফারাক।
অদক্ষতার কারণে কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাজের চাপ, বেতন বৈষম্য, দেশে ঋণের বোঝা এবং পরিবারের দায়—সব মিলিয়ে অনেক শ্রমিক শুরুতেই মানসিক চাপে পড়ে যান। তাই তাদের মুখে ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ দেখা খুবই স্বাভাবিক। তবুও পরিশ্রমী জাতি হিসেবে বাংলাদেশিদের সুনাম সৌদি আরবে সুপরিচিত।
কর্মক্ষেত্রের বাইরে প্রবাসজীবন আরও কঠিন। বিশেষ করে অবিবাহিত শ্রমিকদের জন্য বাসস্থানের সংকট প্রকট। ভালো–মন্দ মিলিয়েই চলে তাদের জীবনের রোজনামচা। পরিবার–পরিজনের স্বস্তির জন্য প্রবাস বেছে নেওয়া মানুষগুলোর জন্য বিনোদনের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। অবসর সময় কাটে মূলত দেশের পরিবারকে ফোন করে বা টেলিভিশন দেখে। পার্ক বা সমুদ্রসৈকতে ব্যাচেলরদের প্রবেশাধিকার সীমিত—তাই কোথাও ঘুরে আসা অনেকের কাছেই বিলাসিতা।
সৌদির বিভিন্ন শহরে রয়েছে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা—’সুক বাংগালি’ বা বাংলা বাজার নামে পরিচিত। এসব এলাকায় রয়েছে বাংলাদেশি সেলুন, রেস্তোরাঁ, মুদি দোকান, সবজি–মাংসের দোকানসহ নানা ব্যবসা। বাংলা নামের সাইনবোর্ড, পানের পিক—সব মিলিয়ে মনে হয় যেন বাংলাদেশেই আছি। সপ্তাহান্তে এসব বাজার জমে ওঠে প্রবাসীদের আড্ডায়। শুঁটকি থেকে শুরু করে লুঙ্গি—দেশের প্রায় সব জিনিসই এখানে পাওয়া যায়।
প্রবাসজীবনের একাকিত্ব দূর করতে দূর–দূরান্তের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা হওয়া যেন মরুভূমিতে শীতল বাতাসের মতো। কেউ রেস্তোরাঁয় বসে আড্ডায় মেতে ওঠেন, কেউ দেশ–বিদেশের খবর নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তোলেন। দিনের শেষে যারা যে ঘরে ফেরেন, সঙ্গে থাকে কেবল কিছু ক্ষণিক আনন্দের স্মৃতি—যা পরদিন নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেশিরভাগের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম। সৌদিতে ভালোভাবে কাজ করতে আরবি ভাষাজ্ঞান অত্যন্ত প্রয়োজন। অথচ দেশে থাকতে তাদের কারওই আরবি শেখার সুযোগ থাকে না। সৌদিতে এসে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদেই তারা অল্প সময়ে আরবি কথ্য ভাষা শিখে নেন।
মধ্যপ্রাচ্যের কৃষিবিপ্লবে বাংলাদেশিদের ভূমিকা অনন্য। সৌদি আরবে বাংলাদেশি কৃষিশ্রমিকরা অভিজ্ঞতা ও সবুজের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে মরুর মধ্যে ফলান নানা জাতের শাকসবজি ও ফল। তাদের কঠোর পরিশ্রমে ফসলের মাঠ তৈরি হয় মরুভূমির বুকে—একটি অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প যেন। তাদের উৎপাদিত এসব ফসল পৌঁছে যায় সৌদির বিভিন্ন সুপারস্টোরে। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিদিনের খাবারের পাতে পান দেশের স্বাদ—যা তাদের তৃপ্তি আর স্মৃতির আবেশে ভরে তোলে।

প্রবাসীর কথা ডেস্ক 



















