মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন এক উদ্বেগজনক প্রবণতা সামনে এসেছে—পানি শোধনাগার বা ‘ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট’ লক্ষ্য করে হামলা। শুষ্ক এই অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষের পানীয় জলের প্রধান উৎস হওয়ায় এসব স্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত।
বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধকালীন সময়ে সাধারণত পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা খুবই বিরল ঘটনা। তবে বর্তমান সংঘাতে লবণাক্ত সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করার এসব কারখানায় হামলার নজির দেখা যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার (৮ মার্চ) ইরানের একটি ড্রোন হামলায় দেশটির একটি পানি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইন অভিযোগ করেছে, ইরান এলোপাথাড়িভাবে বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে পরে দেশটির জাতীয় যোগাযোগ দপ্তর জানায়, এই হামলায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতায় বড় কোনো প্রভাব পড়েনি।
অন্যদিকে, এর আগের দিন ইরান অভিযোগ করে যে যুক্তরাষ্ট্র কেশম দ্বীপের একটি পানি শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ৩০টি গ্রামে পানি সরবরাহ করা হয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের দাবি, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি থেকে ওই হামলা চালানো হয়েছে।
পানি অর্থনীতিবিদ এস্তার ক্রাউসার-ডেলবার্গ এএফপিকে বলেন, “যে পক্ষ প্রথম পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলার পথ বেছে নেবে, তা বর্তমান সংঘাতের চেয়েও বড় ও ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।”
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলের একটি। এখানে পানির প্রাপ্যতা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ কম। ফলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পরিশোধন করে পানীয় জল তৈরি করা এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য অপরিহার্য।
‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট পানি শোধন সক্ষমতার প্রায় ৪২ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত।
২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়—
- সংযুক্ত আরব আমিরাতের পানীয় জলের ৪২%
- সৌদি আরবের ৭০%
- ওমানের ৮৬%
- কুয়েতের ৯০%
এই শোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সরবরাহ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্ল্যান্টে বড় ধরনের ক্ষতি হলে কয়েক দিনের মধ্যেই বড় শহরগুলোতে পানির মারাত্মক সংকট তৈরি হতে পারে। এমনকি ২০০৮ সালের একটি উইকিলিকস নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, সৌদি আরবের জুবাইল শোধনাগার গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এক সপ্তাহের মধ্যে রাজধানী রিয়াদ খালি করে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি সামরিক হামলার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া বা সমুদ্রের পানিতে তেল ছড়িয়ে পড়ার মতো দূষণও এসব প্ল্যান্টের জন্য বড় হুমকি।
ফরাসি প্রতিষ্ঠান ভেওলিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফিলিপ বোর্দো বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশে গুরুত্বপূর্ণ পানি শোধনাগারের চারপাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে।
গত এক দশকে পানি শোধনাগারে হামলার ঘটনা খুবই সীমিত। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা অতীতে সৌদি আরবের কয়েকটি প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছিল। অন্যদিকে ইসরায়েলি হামলায় গাজা উপত্যকার পানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি শোধনাগারে হামলা বাড়লে এর প্রভাব সাময়িক পানির সংকট থেকে শুরু করে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় পর্যন্ত গড়াতে পারে।
এস্তার ক্রাউসার-ডেলবার্গ সতর্ক করে বলেন, “এ ধরনের হামলা বাড়লে বড় শহরগুলো থেকে মানুষ গণহারে চলে যেতে পারে। পানির রেশনিং চালু হতে পারে এবং অর্থনীতি, পর্যটন, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।”
তথ্যসূত্র: এএফপি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 



















