প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে বাণিজ্য, শ্রমবাজার, প্রযুক্তি, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যে একটি যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া।
গত সোমবার (২২ জুন) পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৭ সালের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্য
যৌথ ইশতেহারে দুই দেশ ২০২৭ সালের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে দ্রুত ‘মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ যৌথ বিজনেস কাউন্সিল’ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, বন্দর ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও উভয় দেশ একমত হয়েছে।
শ্রমবাজারে স্বচ্ছতা ও নতুন সুযোগ
মালয়েশিয়া সরকার দেশটির অর্থনীতিতে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানের প্রশংসা করেছে। নতুন কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও চাহিদাভিত্তিক ব্যবস্থা অনুসরণের বিষয়ে দুই দেশ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ দ্রুত বৈঠকে বসবে। পাশাপাশি বিদ্যমান শ্রম চুক্তি পর্যালোচনা করে আধুনিক ও হালনাগাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে অংশীদারিত্ব
ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফিনটেক, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল গভর্ন্যান্স খাতে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও টেস্টিং খাতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের আইটি ও প্রকৌশল খাতের সক্ষমতা যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে দ্বিপাক্ষিক প্রতিভা সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
হালাল শিল্প, শিক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা
মালয়েশিয়ার ইসলামিক উন্নয়ন বিভাগ (জাকিম) বাংলাদেশের হালাল শিল্পের উন্নয়নে সহযোগিতা করবে।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর অবদানের প্রশংসা করে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি খাতে পেট্রোনাস ও পেট্রোবাংলার মধ্যে এলএনজি সরবরাহ ও অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনা ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মালয়েশীয় বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার
দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যৌথ কৌশলগত মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে বিদ্যমান সমঝোতা কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছে মালয়েশিয়া। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পক্ষে তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এছাড়া আসিয়ানের সেক্টোরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় বৃহত্তর অংশগ্রহণের বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে মালয়েশিয়া।
মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান
যৌথ ইশতেহারে ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির পক্ষে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া তাদের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও দেশটির সরকারের প্রতি উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

মালয়েশিয়া প্রতিনিধি: 

















