Dhaka , Saturday, 8 August 2026
শিরোনাম :
বাংলায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রবাসীদের সাবধান করল সৌদি মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং শোকেসে অংশ নিয়েছে প্রাণ মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে হাইকমিশনারের মতবিনিময় ইরাকের নয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন শিয়া আল- সুদানি পোস্টাল ভোটিং: প্রবাসীদের নিবন্ধনের সময় ৫ দিন—কোন দেশে কবে শুরু? বাহরাইন প্রবাসীদের জন্য সচেতনতামূলক মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্প দক্ষিণ আফ্রিকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশিসহ নিহত ১১, আহত ৩১ লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবি, নিহতদের সবাই বাংলাদেশি ‘প্রবাসীর ভোট প্রদান সহজ করা না হলে ভোটাধিকার মূল্যহীন’ স্বল্প খরচে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ

আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিদের আফ্রিকায় পাঠানোর পরিকল্পনা ইউরোপের পাঁচ দেশের

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) থেকে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের ইইউর বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে রাখার রিটার্ন হাব গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে পাঁচ দেশ। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিসের যৌথ এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশিসহ যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল হবে, তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে আফ্রিকার কোনো দেশ বা অন্য কোনো তৃতীয় দেশে অস্থায়ীভাবে রাখা হতে পারে।

 

ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন রিটার্ন রেগুলেশনকে ভিত্তি করে পাঁচ দেশ এই উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে। প্রস্তাবিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সদস্যরাষ্ট্রগুলো ইইউর বাইরে রিটার্ন হাব স্থাপন করতে পারবে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য স্বাগতিক দেশ হিসেবে কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।

এ পরিকল্পনায় সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে গ্রিস। দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, চলতি বছরই তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর থেকেই রিটার্ন হাব কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং যাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না, তাদের সাময়িকভাবে এসব রিটার্ন হাবে রাখা হবে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রিটার্ন হাব নিয়ে ইউরোপের পাঁচ দেশের উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। কারণ বিষয়টি এখনো নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বাংলাদেশসহ কোনো দেশের সঙ্গে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।

 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়; যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে, তাদের সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করা।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার ইউরোপে খুবই কম, যদিও আবেদনকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের স্বীকৃতির হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। তিনি জানান, নতুন রেগুলেশন অনুমোদিত হলে নতুন আশ্রয় আবেদন প্রায় ১২ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। যেসব আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

 

ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তি হলো, বর্তমানে যাদের বহিষ্কার বা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, তাদের এক-তৃতীয়াংশেরও কমকে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপে থেকেই যান এবং আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। রিটার্ন হাব চালু হলে এই প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে বলে তাদের ধারণা।

 

তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার পাঁচ দেশের সরকারকে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ এবং নন-রিফাউলমেন্ট নীতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপের বাইরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা, বিচারিক প্রতিকার এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

 

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ইইউতে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ। ওই বছর বাংলাদেশি নাগরিকদের ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ২৪৫টি ছিল প্রথমবারের আবেদন।

একই সময়ে ৪৩ হাজার ৫২৩টি আবেদনের ওপর প্রথম ধাপের সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেও বছরের শেষে ৪১ হাজার ৬৯২টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। একই বছরে ১ হাজার ১৭০টি আবেদন প্রত্যাহার করা হয়। প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন অনুমোদনের হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।

 

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়টি অনেক আবেদনকারী তাদের আশ্রয়ের আবেদনে উল্লেখ করেছেন। যদিও ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় আশ্রয় আবেদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে, তবুও বাংলাদেশ এখনো ইইউতে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম বড় উৎস দেশ। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যেও বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

 

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের একটি সূত্র জানায়, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা যোগাযোগ আমাদের কাছে আসেনি।

 

সূত্রটি আরও জানায়, ‘বাংলাদেশের নাগরিকদের এখন রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। দীর্ঘদিন পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত হয়েছে। নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত রয়েছে। তাই এখন বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার যৌক্তিকতা আমি দেখি না। সরকার সবসময় অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে এবং বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। অনেকেই অনিয়মিতভাবে ইউরোপে গিয়ে পরে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন, যা সরকার নিরুৎসাহিত করে আসছে।’

 

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী এই উদ্যোগকে মানবাধিকারবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রত্যাবাসন সহজ করার উদ্দেশ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার অফশোর প্রসেসিং ব্যবস্থার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের নীতির ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা কার্যকর আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও বিচারিক প্রতিকারের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। তাই ইউরোপ যদি এমন ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে মানবাধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Rahman

জনপ্রিয় সংবাদ

আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিদের আফ্রিকায় পাঠানোর পরিকল্পনা ইউরোপের পাঁচ দেশের

আপডেট টাইম : 12:12:31 pm, Monday, 27 July 2026

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) থেকে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের ইইউর বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে রাখার রিটার্ন হাব গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে পাঁচ দেশ। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিসের যৌথ এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশিসহ যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল হবে, তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে আফ্রিকার কোনো দেশ বা অন্য কোনো তৃতীয় দেশে অস্থায়ীভাবে রাখা হতে পারে।

 

ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন রিটার্ন রেগুলেশনকে ভিত্তি করে পাঁচ দেশ এই উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে। প্রস্তাবিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সদস্যরাষ্ট্রগুলো ইইউর বাইরে রিটার্ন হাব স্থাপন করতে পারবে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য স্বাগতিক দেশ হিসেবে কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।

এ পরিকল্পনায় সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে গ্রিস। দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, চলতি বছরই তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর থেকেই রিটার্ন হাব কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং যাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না, তাদের সাময়িকভাবে এসব রিটার্ন হাবে রাখা হবে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রিটার্ন হাব নিয়ে ইউরোপের পাঁচ দেশের উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। কারণ বিষয়টি এখনো নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বাংলাদেশসহ কোনো দেশের সঙ্গে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।

 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়; যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে, তাদের সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করা।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার ইউরোপে খুবই কম, যদিও আবেদনকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের স্বীকৃতির হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। তিনি জানান, নতুন রেগুলেশন অনুমোদিত হলে নতুন আশ্রয় আবেদন প্রায় ১২ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। যেসব আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

 

ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তি হলো, বর্তমানে যাদের বহিষ্কার বা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, তাদের এক-তৃতীয়াংশেরও কমকে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপে থেকেই যান এবং আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। রিটার্ন হাব চালু হলে এই প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে বলে তাদের ধারণা।

 

তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার পাঁচ দেশের সরকারকে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ এবং নন-রিফাউলমেন্ট নীতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপের বাইরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা, বিচারিক প্রতিকার এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

 

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ইইউতে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ। ওই বছর বাংলাদেশি নাগরিকদের ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ২৪৫টি ছিল প্রথমবারের আবেদন।

একই সময়ে ৪৩ হাজার ৫২৩টি আবেদনের ওপর প্রথম ধাপের সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেও বছরের শেষে ৪১ হাজার ৬৯২টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। একই বছরে ১ হাজার ১৭০টি আবেদন প্রত্যাহার করা হয়। প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন অনুমোদনের হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।

 

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়টি অনেক আবেদনকারী তাদের আশ্রয়ের আবেদনে উল্লেখ করেছেন। যদিও ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় আশ্রয় আবেদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে, তবুও বাংলাদেশ এখনো ইইউতে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম বড় উৎস দেশ। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যেও বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

 

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের একটি সূত্র জানায়, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা যোগাযোগ আমাদের কাছে আসেনি।

 

সূত্রটি আরও জানায়, ‘বাংলাদেশের নাগরিকদের এখন রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। দীর্ঘদিন পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত হয়েছে। নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত রয়েছে। তাই এখন বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার যৌক্তিকতা আমি দেখি না। সরকার সবসময় অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে এবং বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। অনেকেই অনিয়মিতভাবে ইউরোপে গিয়ে পরে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন, যা সরকার নিরুৎসাহিত করে আসছে।’

 

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী এই উদ্যোগকে মানবাধিকারবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রত্যাবাসন সহজ করার উদ্দেশ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার অফশোর প্রসেসিং ব্যবস্থার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের নীতির ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা কার্যকর আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও বিচারিক প্রতিকারের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। তাই ইউরোপ যদি এমন ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে মানবাধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’