পরীক্ষামূলকভাবে সরকারের উচিত বৈধ পাসপোর্ট, বৈধ কর্মভিসা, চাকরির চুক্তিপত্র ও বিমান টিকিটধারী কর্মীদের বিএমইটির প্রচলিত নিবন্ধন ও বহির্গমন-ছাড়পত্রের জটিলতা ছাড়াই বিদেশযাত্রার সুযোগ দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময় পর এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা। একই সঙ্গে দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও পুলিশি ব্যবস্থাপনা আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট পেশাদার সংস্থার দক্ষ, সুশৃঙ্খল ও সৎ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
দেশত্যাগকারী ও দেশে প্রত্যাবর্তনকারী প্রত্যেক নাগরিক যেন শান্তিপূর্ণ, সম্মানজনক এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশে বিমানবন্দর অতিক্রম করতে পারেন—এটি কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একজন নাগরিক যেন ইতিবাচক অনুভূতি, আস্থা ও দেশের প্রতি সম্মান নিয়ে বিদেশে যান এবং আনন্দ, স্বস্তি ও গর্ব নিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরও আমাদের বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সেবায় প্রত্যাশিত শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, সৌজন্য ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশত্যাগের সময় অনেক যাত্রী এমন অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, হয়রানি ও অসম্মানের সম্মুখীন হন যে তাঁরা আর দেশে ফিরতে চান না। আবার দেশে ফিরে বিমানবন্দরে পৌঁছেই অনেকে ভাবেন—কেন ফিরে এলাম?
এটি শুধু একজন যাত্রীর ব্যক্তিগত হতাশা নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং দেশের প্রতি নাগরিকের আস্থার সংকট। একটি দেশের বিমানবন্দরই বিদেশি অতিথি, বিনিয়োগকারী, প্রবাসী ও নাগরিকের কাছে সেই রাষ্ট্রের প্রথম এবং শেষ পরিচয়। সেখানকার অব্যবস্থাপনা গোটা জাতির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে।
বিএমইটি নিবন্ধন যদি শ্রমিকের নিরাপত্তা, তথ্য সংরক্ষণ ও রাষ্ট্রীয় তদারকির জন্য একান্তই প্রয়োজনীয় হয়, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি অবশ্যই সম্পূর্ণ ডিজিটাল, স্বয়ংক্রিয় ও তাৎক্ষণিক হতে হবে। বিদেশগামী কর্মী বা তাঁর অনুমোদিত প্রতিনিধি অনলাইনে তথ্য নিবন্ধন করবেন, যা সঙ্গে সঙ্গে একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে সংরক্ষিত হবে। বৈধ ই-পাসপোর্ট, কর্মভিসা, চাকরির চুক্তিপত্র এবং বিমান টিকিট ডিজিটালভাবে যাচাই হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয় ছাড়পত্র প্রদান করা উচিত।
এই প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় দপ্তর, মধ্যস্বত্বভোগী, ব্যক্তিনির্ভর অনুমোদন কিংবা দীর্ঘসূত্রতার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। সরকারি নিবন্ধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া—তাঁর বৈধ বিদেশযাত্রা বাধাগ্রস্ত করা নয়।
প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যত অস্বচ্ছ, জটিল ও ব্যক্তিনির্ভর হয়, ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি, ষড়যন্ত্র এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির সুযোগ ততই বৃদ্ধি পায়। একজন বৈধ ভিসাধারী কর্মীকে অযৌক্তিকভাবে আটকে দেওয়া মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়; এর ফলে তাঁর পরিবার, নিয়োগকর্তা, বৈদেশিক শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং দেশের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দারিদ্র্য কোনো জাতির জন্য লজ্জার বিষয় নয়; কিন্তু দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং মানুষের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করে দারিদ্র্যকে স্থায়ী করে রাখা অত্যন্ত লজ্জাজনক। বাংলাদেশের বিপুল মানবসম্পদ, প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক নেতৃত্ব, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও সৎ প্রশাসন থাকলে বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ, বিশ্বাসযোগ্য, সম্মানিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—সরকার পরিবর্তিত হয়েছে, রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত হয়েছে, নেতৃত্ব ও কর্মকর্তা পরিবর্তিত হয়েছেন; অথচ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, প্রশাসনিক হয়রানি এবং দুর্নীতির সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ ও অবনমিত হচ্ছে। এভাবে একটি সম্ভাবনাময় জাতিকে ক্রমাগত পিছিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতীয় নেতৃত্বকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—রাষ্ট্র কি নাগরিকের পথ সহজ করবে, নাকি অপ্রয়োজনীয় বাধা সৃষ্টি করে তাঁর সম্ভাবনা ধ্বংস করবে? বৈধভাবে বিদেশগামী কর্মীরা দেশের বোঝা নন; তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতি, রেমিট্যান্স, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
অতএব এখনই প্রয়োজন:
* বৈধ কর্মভিসাধারীদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বিএমইটির প্রচলিত ছাড়পত্রের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা;
* বিএমইটি নিবন্ধনকে শতভাগ ডিজিটাল, তাৎক্ষণিক ও স্বয়ংক্রিয় করা;
* বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও পুলিশি ব্যবস্থাপনা সংস্কারে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা;
* যাত্রী হয়রানি, ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা কার্যকর করা;
* প্রতিটি সেবা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা;
* প্রবাসী কর্মী, সাধারণ নাগরিক, বিদেশি অতিথি ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্মানজনক ও সেবাবান্ধব বিমানবন্দর নিশ্চিত করা।
আর বিলম্ব নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর জবাবদিহি, পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তর এবং নাগরিকের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এখনই মৌলিক সংস্কার শুরু করতে হবে। বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে একটি বিশ্বাসযোগ্য, সম্মানিত, আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিমানবন্দর ও বিদেশগমন ব্যবস্থাকে দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং হয়রানির সংস্কৃতি থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে।

ডক্টর সৈয়দ শাহ্জাহান 

















