প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নন-রেসিডেন্ট কনভার্টিবল টাকা অ্যাকাউন্ট (এনআরসিটিএ) ব্যবহারের সুযোগ আরও বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন বিদেশে চাকরিতে যাওয়ার আগে কোনো প্রাথমিক জমা ছাড়াই বাংলাদেশি নাগরিকরা এ হিসাব খুলতে পারবেন। এমনকি দেশে সাময়িক অবস্থানরত প্রবাসীরাও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এনআরসিটিএ খোলার সুযোগ পাবেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ থেকে জারি করা এক সার্কুলারে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। নতুন নির্দেশনায় আগের ২৩ জুন জারি করা একই বিভাগের ১৪ নম্বর সার্কুলারটি বাতিল করা হয়েছে। সার্কুলারে স্বাক্ষর করেছেন বিভাগের পরিচালক নাসিমা সুলতানা।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তপশিলি ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট ও অনুমোদিত ডিলার শাখায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা সঞ্চয়ী, চলতি বা মেয়াদি আমানত—যেকোনো ধরনের এনআরসিটিএ হিসাব খুলতে পারবেন।
ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা বৈধ প্রবাসী আয়, অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব থেকে স্থানান্তরিত অর্থ এবং অনুমোদিত বিনিময় প্রতিষ্ঠান, অর্থ স্থানান্তরকারী প্রতিষ্ঠানসহ বৈধ অর্থ পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসা অর্থ প্রচলিত বিনিময় হারে টাকায় রূপান্তরের পর এনআরসিটিএতে জমা করা যাবে।
এ ছাড়া অন্য এনআরসিটিএ থেকে স্থানান্তরিত অর্থ, হিসাবের সুদ বা মুনাফা এবং ওই হিসাব বা প্রবাসী আয় দিয়ে করা বৈধ বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাবাসনযোগ্য অর্থও জমা করা যাবে।
বাংলাদেশি কোম্পানির নতুন শেয়ার ইস্যুতে এনআরসিটিএ থেকে বিনিয়োগ করা অর্থ পরে ফেরত এলে সেটিও হিসাবে জমা করা যাবে। একইভাবে এনআরসিটিএ থেকে পরিশোধ করা অর্থের ফেরতও এ হিসাবে নেওয়া যাবে।
এনআরসিটিএতে থাকা মূল অর্থের পাশাপাশি অর্জিত সুদ বা মুনাফাও অবাধে বিদেশে ফেরত নেওয়া যাবে। এ হিসাবের অর্থ দিয়ে দেশে বৈধ খরচ মেটানো যাবে। পাশাপাশি অন্য এনআরসিটিএ বা অনাবাসী টাকা হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করা যাবে।
চাইলে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যক্তিগত বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব বা অনাবাসী বৈদেশিক মুদ্রা আমানত হিসাবেও নেওয়া যাবে।
প্রত্যাবাসনযোগ্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য শেয়ার কেনা, পোর্টফোলিও বিনিয়োগের জন্য অনাবাসী বিনিয়োগকারীর টাকা হিসাবে অর্থ স্থানান্তর এবং মূলধন ও মুনাফা বিদেশে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে—এমন অন্যান্য বিনিয়োগেও এ অর্থ ব্যবহার করা যাবে।
বাংলাদেশে ফেরার সময় হিসাবধারী নির্ধারিত সীমার মধ্যে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার নোটও নিতে পারবেন। তবে এনআরসিটিএতে জমা করার উদ্দেশ্যে দেশে আসা প্রবাসী আয়ে সাধারণত প্রচলিত প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না, যদি না বাংলাদেশ ব্যাংক আলাদাভাবে কোনো সুবিধা নির্ধারণ করে।
তবে বাংলাদেশে ব্যবসা বা সেবা দিয়ে অর্জিত আয় এনআরসিটিএতে জমা করা যাবে না।
প্রবাসীদের জন্য নতুন নির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি সুবিধা হলো, এনআরসিটিএর আমানত জামানত রেখে ব্যাংক থেকে টাকায় ঋণ নেওয়া যাবে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা বৈধ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এ ঋণ ব্যবহার করা যাবে।
এমনকি বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনযোগ্য নয়—এমন সরাসরি বিনিয়োগ এবং নিজের ব্যবহারের জন্য আবাসিক সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রেও এ ঋণ নেওয়া যাবে।
তবে এ ঋণ পুনঃঋণ, কৃষি বা বনায়নজাতীয় কার্যক্রম কিংবা আবাসন ব্যবসায় ব্যবহার করা যাবে না। আমানত জামানত দেওয়ার বিপরীতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনও করা যাবে না।
ঋণ পরিশোধ করতে হবে এনআরসিটিএর আমানত সমন্বয় করে অথবা ব্যাংকিং চ্যানেলে নতুন করে প্রবাসী আয় এনে।
সার্কুলারে ব্যাংকগুলোর জন্যও এনআরসিটিএর আমানত ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলো বিশেষায়িত অঞ্চলের ‘এ’ শ্রেণির শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে অনুমোদিত চলতি খরচ—যেমন বেতন, মজুরি ও ইউটিলিটি বিল—মেটাতে টাকায় অর্থায়ন করতে পারবে। তবে এ ঋণ শুধু রপ্তানি আয় থেকে পরিশোধ করতে হবে।
এ ছাড়া অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো এনআরসিটিএর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে যোগ্য গ্রাহকদের নিয়মিত টাকায় ঋণ দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত ঋণনীতি, সতর্কতামূলক বিধান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য নির্দেশনা মানতে হবে।
এনআরসিটিএ পরিচালনার ক্ষেত্রেও নমনীয়তা আনা হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশি চাইলে দেশে থাকা কোনো ব্যক্তিকে আইনগত ক্ষমতাপত্র দিয়ে হিসাব পরিচালনার অনুমতি দিতে পারবেন।
হিসাবধারীর মৃত্যু হলে চুক্তি ও প্রচলিত বিধি মেনে হিসাবের অর্থ অনাবাসী মনোনীত ব্যক্তির কাছে বিদেশে পাঠানো যাবে।
স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসার পরও এনআরসিটিএ চালু রাখা যাবে। ওই হিসাবে অবসরকালীন সুবিধা, পেনশন, অবসর ভাতা বা বিদেশ থেকে পাওয়া অন্যান্য বৈধ আয় জমা করা যাবে। এসব অর্থ বৈধভাবে বিদেশে পরিশোধেও ব্যবহার করা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে এনআরসিটিএতে অনলাইনে হিসাব খোলা ও ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং সুবিধা চালুর জন্য উৎসাহিত করেছে। এ ধরনের সুবিধা চালুর আগে ব্যাংকগুলোকে হিসাবের বৈশিষ্ট্য, পরিচালন পদ্ধতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পরিপালন কাঠামো সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, এনআরসিটিএর অর্থ এবং এসব অর্থ থেকে দেওয়া ঋণের হিসাব আলাদাভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে অর্থের উৎস ও ব্যবহার স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়। একই সঙ্গে গ্রাহক পরিচিতি যাচাই, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ, কর, সতর্কতামূলক বিধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

প্রবাসীর কথা ডেস্ক 















