Dhaka , Saturday, 31 October 2026
শিরোনাম :
বৈধ বিদেশযাত্রা হোক সহজ, বন্ধ হোক অযথা হয়রানি বাংলায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রবাসীদের সাবধান করল সৌদি মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং শোকেসে অংশ নিয়েছে প্রাণ মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে হাইকমিশনারের মতবিনিময় ইরাকের নয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন শিয়া আল- সুদানি পোস্টাল ভোটিং: প্রবাসীদের নিবন্ধনের সময় ৫ দিন—কোন দেশে কবে শুরু? বাহরাইন প্রবাসীদের জন্য সচেতনতামূলক মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্প দক্ষিণ আফ্রিকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশিসহ নিহত ১১, আহত ৩১ লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবি, নিহতদের সবাই বাংলাদেশি ‘প্রবাসীর ভোট প্রদান সহজ করা না হলে ভোটাধিকার মূল্যহীন’

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ সরকারের

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বৈচিত্র্য আনতে ব্যাপক উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে তরুণ ও যুবকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হলো অপ্রথাগত আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সুযোগ কাজে লাগানো। এ লক্ষ্যে সরকার বিকল্প ও উদীয়মান আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে সরকার এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই মহাপরিকল্পনায় সরকারের মূল লক্ষ্যসমূহের মধ্যে রয়েছে- নতুন ও উন্নত বাজারের সন্ধান, উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করা, নিরাপদ অভিবাসন ও দালালচক্র নির্মূল, সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও আইনি সুরক্ষা ও অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা।

 

নতুন ও উন্নত বাজার সৃষ্টিতে সরকার মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত বাজারের বাইরে ইউরোপ (যেমন: ইতালি, জার্মানি, গ্রিস, রোমানিয়া), জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশের নতুন শ্রমবাজারে জায়গা করে নিতে চায়।

 

উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলাও সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

 

এদিকে, নিরাপদ অভিবাসন ও দালালচক্র নির্মূল করতে সরকারি বৈধ চ্যানেল এবং আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত করে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এবং বিদেশগমনের খরচ বা অভিবাসন ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতেও কাজ করছে সরকার।

 

সরকার সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মপরিবেশ ও আইনি ব্যবস্থাপনার মান কঠোরভাবে যাচাই করে কর্মী পাঠাতে চায়, যাতে প্রবাসীরা কর্মক্ষেত্রে শোষণমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ পান।

 

এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের এই সময়ে বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি সুদৃঢ় করে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

 

এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সারাদেশে বর্তমানে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

 

বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), আধুনিক ড্রাইভিং, নার্সিং, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল এবং হসপিটালিটিসহ মোট ৫৫টি কারিগরি কোর্সে তরুণ-তরুণীদের দক্ষ করে তোলা হচ্ছে।

 

বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের প্রধান শর্ত হিসেবে ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান ও আরবি ভাষার ওপর বিশেষায়িত ভাষাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

 

কর্মীদের দক্ষতা যেন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, সেজন্য বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ সার্টিফিকেশন ও স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ দেশের বেকারত্ব দূরীকরণের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবাহ ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

 

রেমিট্যান্স প্রবাহের এ ইতিবাচক ধারা শুধু ধরে রাখই নয়, এর প্রবাহ বাড়াতে সরকার অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে চাহিদাভিত্তিক কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

 

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার পর সম্প্রতি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন উদ্যোগের আওতায় ৩৩৮টি অনুমোদিত ও তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।

 

এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ বিনা খরচে (জিরো-কস্ট) ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) তত্ত্বাবধানে এ বিশেষ পাইলট কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।

 

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী (এসএসডব্লিউ) নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তিও কার্যকর রয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় জাপানি ভাষায় স্বীকৃত দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট কারিগরি ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সনদধারী বাংলাদেশি কর্মীরা বয়স্কদের সেবাযত্ন, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, কৃষি ও আতিথেয়তা খাতে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের আইনি সুরক্ষা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে।

 

ইউরোপের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ

 

ইউরোপ ও ওশেনিয়া অঞ্চলে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যৌথভাবে ‘সাপোর্টিং আ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ উইথ বাংলাদেশ’ শীর্ষক কাঠামোর আওতায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

 

এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ইউরোপের শ্রমবাজারে জনমিতিক পরিবর্তনজনিত শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় নিরাপদ, নিয়মিত ও নথিভুক্ত পথে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মী পাঠানো।

 

রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল এ আন্তর্জাতিক প্রকল্পের অন্যতম প্রধান বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। প্রকল্পের অগ্রগতি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বোয়েসেল ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সমন্বিত অনলাইন ডেটাবেজ ব্যবহার করে ইইউ-স্বীকৃত দক্ষ পেশাজীবীদের সঙ্গে ইউরোপীয় নিয়োগদাতাদের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করছে।

 

এদিকে, ইতালি সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রাক-প্রস্থান ওরিয়েন্টেশন, প্রশিক্ষণ এবং ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ কর্মীরা সরাসরি ইতালির কাজের ভিসা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

 

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবা খাতেও সরকার অনুমোদিত স্পনসরশিপ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশি নার্স ও কেয়ারগিভারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

 

একই সময়ে জার্মানির নতুন ‘অপরচুনিটি কার্ড’ বা ‘চান্সেনকার্টে’ ব্যবস্থার আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও প্রকৌশলীরা দেশটিতে সরাসরি চাকরি খোঁজার সুযোগ পাচ্ছেন।

 

পূর্ব ইউরোপের রোমানিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরি কৃষি, সরবরাহব্যবস্থা, ডেলিভারি সেবা এবং আতিথেয়তা খাতে বৈধভাবে দক্ষ কর্মী পাঠানোর গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

 

ওশেনিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ

 

ওশেনিয়া অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে কৃষি খাতের মৌসুমি কাজ, নির্মাণ এবং মোটরগাড়ি মেরামত-সংক্রান্ত কাজে নির্দিষ্ট কোটার আওতায় বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।

 

পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার পোশাক ও উৎপাদনশিল্পে অধিক মূল্য সংযোজনমূলক কারিগরি পদের কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রতিবছর বাড়ছে। মালদ্বীপ ও সেশেলসের আবাসন, নির্মাণ ও পর্যটন খাতেও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা রয়েছে।

 

অভিবাসন ব্যয় কমানো ও কর্মীদের সুরক্ষায় উদ্যোগ

 

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং কর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশেষ ডিজিটাল ‘মাইগ্র্যান্ট কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করেছে।

 

এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাসীরা রেমিট্যান্সের ওপর বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা, নির্দিষ্ট বিমা সুরক্ষা এবং বিদেশে জরুরি আইনি সহায়তা সরাসরি পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

 

একই সঙ্গে অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা কার্যকর করছে সরকার।

 

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) পাঠ্যক্রমে বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে। সূত্র: বাসস

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Rahman

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ সরকারের

আপডেট টাইম : 10:28:51 am, Saturday, 31 October 2026

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বৈচিত্র্য আনতে ব্যাপক উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে তরুণ ও যুবকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হলো অপ্রথাগত আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সুযোগ কাজে লাগানো। এ লক্ষ্যে সরকার বিকল্প ও উদীয়মান আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে সরকার এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই মহাপরিকল্পনায় সরকারের মূল লক্ষ্যসমূহের মধ্যে রয়েছে- নতুন ও উন্নত বাজারের সন্ধান, উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করা, নিরাপদ অভিবাসন ও দালালচক্র নির্মূল, সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও আইনি সুরক্ষা ও অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা।

 

নতুন ও উন্নত বাজার সৃষ্টিতে সরকার মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত বাজারের বাইরে ইউরোপ (যেমন: ইতালি, জার্মানি, গ্রিস, রোমানিয়া), জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশের নতুন শ্রমবাজারে জায়গা করে নিতে চায়।

 

উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলাও সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

 

এদিকে, নিরাপদ অভিবাসন ও দালালচক্র নির্মূল করতে সরকারি বৈধ চ্যানেল এবং আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত করে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এবং বিদেশগমনের খরচ বা অভিবাসন ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতেও কাজ করছে সরকার।

 

সরকার সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মপরিবেশ ও আইনি ব্যবস্থাপনার মান কঠোরভাবে যাচাই করে কর্মী পাঠাতে চায়, যাতে প্রবাসীরা কর্মক্ষেত্রে শোষণমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ পান।

 

এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের এই সময়ে বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি সুদৃঢ় করে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

 

এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সারাদেশে বর্তমানে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

 

বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), আধুনিক ড্রাইভিং, নার্সিং, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল এবং হসপিটালিটিসহ মোট ৫৫টি কারিগরি কোর্সে তরুণ-তরুণীদের দক্ষ করে তোলা হচ্ছে।

 

বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের প্রধান শর্ত হিসেবে ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান ও আরবি ভাষার ওপর বিশেষায়িত ভাষাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

 

কর্মীদের দক্ষতা যেন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, সেজন্য বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ সার্টিফিকেশন ও স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ দেশের বেকারত্ব দূরীকরণের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবাহ ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

 

রেমিট্যান্স প্রবাহের এ ইতিবাচক ধারা শুধু ধরে রাখই নয়, এর প্রবাহ বাড়াতে সরকার অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে চাহিদাভিত্তিক কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

 

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার পর সম্প্রতি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন উদ্যোগের আওতায় ৩৩৮টি অনুমোদিত ও তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।

 

এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ বিনা খরচে (জিরো-কস্ট) ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) তত্ত্বাবধানে এ বিশেষ পাইলট কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।

 

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী (এসএসডব্লিউ) নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তিও কার্যকর রয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় জাপানি ভাষায় স্বীকৃত দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট কারিগরি ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সনদধারী বাংলাদেশি কর্মীরা বয়স্কদের সেবাযত্ন, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, কৃষি ও আতিথেয়তা খাতে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের আইনি সুরক্ষা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে।

 

ইউরোপের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ

 

ইউরোপ ও ওশেনিয়া অঞ্চলে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যৌথভাবে ‘সাপোর্টিং আ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ উইথ বাংলাদেশ’ শীর্ষক কাঠামোর আওতায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

 

এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ইউরোপের শ্রমবাজারে জনমিতিক পরিবর্তনজনিত শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় নিরাপদ, নিয়মিত ও নথিভুক্ত পথে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মী পাঠানো।

 

রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল এ আন্তর্জাতিক প্রকল্পের অন্যতম প্রধান বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। প্রকল্পের অগ্রগতি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বোয়েসেল ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সমন্বিত অনলাইন ডেটাবেজ ব্যবহার করে ইইউ-স্বীকৃত দক্ষ পেশাজীবীদের সঙ্গে ইউরোপীয় নিয়োগদাতাদের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করছে।

 

এদিকে, ইতালি সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রাক-প্রস্থান ওরিয়েন্টেশন, প্রশিক্ষণ এবং ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ কর্মীরা সরাসরি ইতালির কাজের ভিসা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

 

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবা খাতেও সরকার অনুমোদিত স্পনসরশিপ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশি নার্স ও কেয়ারগিভারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

 

একই সময়ে জার্মানির নতুন ‘অপরচুনিটি কার্ড’ বা ‘চান্সেনকার্টে’ ব্যবস্থার আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও প্রকৌশলীরা দেশটিতে সরাসরি চাকরি খোঁজার সুযোগ পাচ্ছেন।

 

পূর্ব ইউরোপের রোমানিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরি কৃষি, সরবরাহব্যবস্থা, ডেলিভারি সেবা এবং আতিথেয়তা খাতে বৈধভাবে দক্ষ কর্মী পাঠানোর গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

 

ওশেনিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ

 

ওশেনিয়া অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে কৃষি খাতের মৌসুমি কাজ, নির্মাণ এবং মোটরগাড়ি মেরামত-সংক্রান্ত কাজে নির্দিষ্ট কোটার আওতায় বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।

 

পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার পোশাক ও উৎপাদনশিল্পে অধিক মূল্য সংযোজনমূলক কারিগরি পদের কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রতিবছর বাড়ছে। মালদ্বীপ ও সেশেলসের আবাসন, নির্মাণ ও পর্যটন খাতেও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা রয়েছে।

 

অভিবাসন ব্যয় কমানো ও কর্মীদের সুরক্ষায় উদ্যোগ

 

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং কর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশেষ ডিজিটাল ‘মাইগ্র্যান্ট কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করেছে।

 

এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাসীরা রেমিট্যান্সের ওপর বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা, নির্দিষ্ট বিমা সুরক্ষা এবং বিদেশে জরুরি আইনি সহায়তা সরাসরি পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

 

একই সঙ্গে অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা কার্যকর করছে সরকার।

 

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) পাঠ্যক্রমে বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে। সূত্র: বাসস