বিদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদন প্রক্রিয়ায় ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে পুরোপুরি অনলাইন ব্যবস্থা চালুকে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে মালয়েশিয়ার শিল্প খাত। নতুন ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তাদের বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য সরকারি দপ্তরে গিয়ে ম্যানুয়ালি আবেদন জমা দিতে হবে না।
মালয়েশিয়ান ম্যানুফ্যাকচারার্স ফেডারেশনের (এফএমএম) সভাপতি জ্যাকব লি চোর কোক বলেন, ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) মাধ্যমে নতুন আবেদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি চালু হয়েছে। তবে এ ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে দ্রুত অনুমোদন, প্রশাসনিক জটিলতা ও নিয়োগ ব্যয় কমানো এবং পুরো প্রক্রিয়ায় নিয়োগকর্তাদের স্বচ্ছতা ও নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার ওপর।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ১৪ দিনের মধ্যে কন্ডিশনাল অ্যাপ্রুভাল লেটার (এসকেবি) দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ সেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এ সময়সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সাক্ষাৎকার ও বিদেশি কর্মী নিয়োগের লেভি পরিশোধসহ গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
লি চোর কোক মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়কে (কেসুমা) আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের সময়সীমা আরও স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন। আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা জানার সুযোগসহ স্বচ্ছ স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
উৎপাদন খাতের যেসব আবেদন বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছেন এফএমএম সভাপতি। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও উৎপাদন ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিঘ্ন কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
কৃষি ও নির্মাণ খাতে ছাড়ের দাবি
এদিকে মালয়েশিয়ার অ্যাসোসিয়েটেড চাইনিজ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এসিসিসিআইএম) বিদেশি কর্মীর কোটা আবেদনের আগে কৃষি ও নির্মাণ খাতের নিয়োগকর্তাদের মাইফিউচারজবস পোর্টালে শূন্যপদের বিজ্ঞাপন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
সংগঠনটি বলেছে, কৃষি ও নির্মাণ খাতে স্থানীয় কর্মী আকর্ষণে নিয়োগকর্তাদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। বর্তমানে শুধু প্ল্যান্টেশন খাত এ বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে।
এসিসিসিআইএম আরও প্রস্তাব করেছে, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় মন্ত্রণালয় এবং কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (সিআইডিবি) মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সাক্ষাৎকার সপ্তাহে এক দিনের পরিবর্তে একাধিক দিনে আয়োজন করা হোক।
একই সঙ্গে পুত্রজায়ায় সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের নির্ধারিত স্থানগুলোতেও এসব সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
তাদের মতে, বর্তমানে নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাতের জন্য সপ্তাহে মাত্র একবার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করা হয়। এতে আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক চাপ বাড়ছে। আরও বেশি সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী নিয়োগ করা হলে এ চাপ কমানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে।
এর আগে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বিদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদন এখন থেকে এফডব্লিউসিএমএসের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অনলাইনে প্রক্রিয়াকরণ করা হবে। এর ফলে নিয়োগকর্তাদের ম্যানুয়ালি আবেদন জমা দেওয়া কিংবা সরকারি দপ্তরে সরাসরি গিয়ে আবেদন করার প্রয়োজন হবে না।
মন্ত্রণালয়ের মতে, এ ডিজিটাল ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো সরকারি দপ্তরে বারবার যাতায়াতের প্রয়োজন কমানো, অপেক্ষার সময় সংক্ষিপ্ত করা এবং পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ করা।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন অনলাইন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিদেশি কর্মী নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমবে। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তারা তাদের আবেদনের অগ্রগতি সহজেই জানতে পারবেন।
বাংলাদেশেও অনলাইন ব্যবস্থার উদ্যোগ
এদিকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
১৮ আগস্ট এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বৈধতা, বিদেশে কর্মীর চাহিদাসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনা হবে। অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এ ক্ষেত্রে সমাজের প্রতিটি স্তরকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, অবৈধ পথে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার কথা না ভেবে নিজেদের স্বার্থে কাজ করছে। এসব চক্রের রুট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ থেকে শুরু করে মাদারীপুরসহ কয়েকটি জেলায় আগামী এক মাস ব্যাপক প্রচার চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিদেশ যাওয়ার জন্য অনেকে জমিজমাসহ মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করেন। পরে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়লে পরিবার-পরিজন নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। তাই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির ও গির্জাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব
বিদেশি নিয়োগকর্তারা যে ধরনের দক্ষতার কর্মী চান, অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে সেই দক্ষতার কর্মী পাঠানো হয় না বলেও উল্লেখ করেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কোনো নিয়োগকর্তার প্লাম্বার বা ইলেকট্রিশিয়ানের প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্ট কাজের দক্ষতা না থাকা ব্যক্তিকে পাঠানোর ঘটনা ঘটে। এতে কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়ই সমস্যায় পড়েন।
মন্ত্রী জানান, কোনো দেশ নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মী চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়োগকর্তার প্রতিনিধি বা প্রশিক্ষক বাংলাদেশে এসে কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই করবেন। প্রশিক্ষণে সন্তুষ্ট হওয়ার পর তারা কর্মী নিয়োগ করবেন।
বাংলাদেশ থেকে ৬ হাজার চালক সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের পদ্ধতি চালু হয়েছে বলেও জানান তিনি। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ কমবে বলে মনে করেন মন্ত্রী।
প্রবাসীদের সেবা সহজ করার পরিকল্পনা
প্রবাসীদের বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে দূরদূরান্ত থেকে দূতাবাস বা কনস্যুলেটে যেতে হয় উল্লেখ করে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এতে প্রবাসীদের সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। তাই সরকারি সেবা প্রদানে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কিছু সেবা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নথি ডাক বা কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে প্রবাসীদের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর সরকারি পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ কার্ড চালুর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে বলে তিনি জানান।
প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে ভূমি ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে বলেও জানান প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী।

প্রবাস ডেস্ক 
















