দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় গতি ফিরেছে। নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নিয়োগকর্তার চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার) ও ক্ষমতাপত্র (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) সত্যায়নের কাজ জোরেশোরে চালিয়ে যাচ্ছে কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন।
এরই মধ্যে ৮ হাজার ৬০০-এর বেশি কর্মী নিয়োগের বিপরীতে ২৫৪টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫৭০ কর্মীর নিয়োগসংক্রান্ত ১৩০টি আবেদন সত্যায়ন করেছে হাইকমিশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা হাইকমিশনের ই-অ্যাম্বাসি ব্যবস্থায় অনলাইনে আবেদন করছেন। অনলাইন আবেদনের পাশাপাশি দূতাবাসের নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের হার্ডকপি মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়নসহ সরাসরি হাইকমিশনে জমা দিতে হচ্ছে।
আবেদন পাওয়ার পর হাইকমিশনারের অনুমোদনক্রমে শ্রম কল্যাণ উইংয়ের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শন করছেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা, কর্মপরিবেশ, শ্রমিকদের আবাসনব্যবস্থা এবং অতীতের রেকর্ড যাচাই করা হচ্ছে। সবকিছু সন্তোষজনক হলে রাষ্ট্রদূতের অনুমোদন নিয়ে অনলাইনে চাহিদাপত্র ও ক্ষমতাপত্র সত্যায়ন করা হচ্ছে।
সত্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট তথ্য বাংলাদেশে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিএমইটির মহাপরিচালক, সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তার কাছে পাঠানো হচ্ছে।
তবে সব আবেদনই সত্যায়ন পাচ্ছে না। কোম্পানির কর্মস্থল ও শ্রমিকদের আবাসন মালয়েশিয়ার নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন সত্যায়ন করেনি হাইকমিশন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্মস্থল, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও আবাসনব্যবস্থা নির্ধারিত মান অনুযায়ী নিশ্চিত করতে পারলেই পুনরায় সত্যায়নের সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
হাইকমিশন সূত্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ই-অ্যাম্বাসি ব্যবস্থায় ২৫৪টি আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদনের বিপরীতে কর্মীর সংখ্যা ৮ হাজার ৬০০-এর বেশি। এর মধ্যে ১৬১টি কোম্পানি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের হার্ডকপি জমা দিয়েছে। এসব আবেদনে কর্মীর সংখ্যা ৬ হাজার ৪৭৫ জন। ইতোমধ্যে ১৩০টি আবেদনের বিপরীতে ৪ হাজার ৫৭০ কর্মীর চাহিদাপত্র সত্যায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ না করায় দুটি কোম্পানির ৪০ কর্মীর আবেদন সত্যায়ন করা হয়নি।
সূত্র আরও জানায়, কাগজপত্র জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৩২টি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ২৮টি আবেদন পর্যালোচনা ও সরেজমিন যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাই শেষে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একদিকে নতুন আবেদন জমা পড়ছে, অন্যদিকে যাচাই-বাছাই শেষে সত্যায়নও চলছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি এখন চলমান রয়েছে।
গত ৫ নভেম্বর রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে অস্থায়ী জনবল পাঠিয়ে সত্যায়ন কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। মন্ত্রীর এ আশ্বাসে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
এদিকে এফডব্লিউসিএমএসে তালিকাভুক্ত ২৫টি প্রিন্সিপাল বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির একজন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের এজেন্সির মাধ্যমে যেসব কর্মী মালয়েশিয়ায় যাবেন, তারা যেন সেখানে গিয়ে কাজ পান, নিরাপদে থাকেন এবং নিয়ম অনুযায়ী উপার্জন করতে পারেন। কাজ না পেয়ে বিপদে পড়া, নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরা কিংবা অবৈধ হয়ে কারাগারে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি আমরা আর দেখতে চাই না।’
তিনি বলেন, ‘অতীতে বিভিন্ন সময়ে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় গিয়ে কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। কেউ কেউ কারাগারেও গেছেন। এতে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে তাদের পক্ষে নতুন কর্মী নিয়োগ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষায় মন্ত্রণালয় ও হাইকমিশনের পূর্ণ সহযোগিতা চাই। সবকিছু যাচাই করেই অনুমতি দেওয়া হোক।’
একই সঙ্গে আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, দূতাবাস আবেদনগুলো ফেলে না রেখে দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করুক এবং সব শর্ত পূরণ হলে সত্যায়ন করে দিক। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও গাইডলাইন মেনেই আমরা কাজ করতে প্রস্তুত।’
২০১৭-১৮ সালে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সময় বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রতিটি নিয়োগকর্তার সক্ষমতা সরেজমিন যাচাই করে চাহিদাপত্র সত্যায়ন করেছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই সময়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কর্মীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো ফল পাওয়া গিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ২০২২-২৪ সালে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে হাইকমিশনের সরেজমিন যাচাইয়ের পরিবর্তে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেরাই প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যাচাই করে। ফলে নিয়োগকর্তাদের প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে।
এবার আবারও প্রতিটি নিয়োগকর্তার প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শন করে সত্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আবেদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি দ্রুত সেবা প্রদানও জরুরি। নিয়োগকর্তাদের সক্ষমতা যাচাই, রিক্রুটিং এজেন্সির জবাবদিহি এবং হাইকমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা ও আন্তরিকতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই অতীতের অনিয়ম ও ভোগান্তি এড়িয়ে একটি সুশৃঙ্খল নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

মালয়েশিয়া প্রতিনিধি: 
















